আমার রাজশাহী কলেজ

রাজশাহী শহরেই আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা। সে কারণেই আশৈশব এর গৌরব, ঐতিহ্যের সাথে একাত্ম আমি। খুব ছোটবেলায় প্রতিদিন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেতে হত ফিজিওথেরাপি নিতে। যাবার পথেই পড়ত রাজশাহী কলেজ। বাবা এই কলেজের ছাত্র ছিলেন না, কিন্তু তিনি যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন রাজশাহী কলেজেই তাঁদের ক্লাস হত। এমন কি তাঁর আবাসস্থল ছিল ফুলার হোস্টেল। কত স্মৃতি তাঁর এই কলেজের সাথে। তাঁর রুমমেট ছিলেন মনিরুজ্জামান মিয়া। ফুটবল খেলতেন গোলাম আরিফ টিপুর সাথে। তাঁর মুখেই শুনেছি মর্যাদার দিক থেকে অবিভক্ত ভারতবর্ষে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের পরেই স্থান ছিল রাজশাহী কলেজের। কিংবদন্তির সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, গবেষক, বিপ্লবী, সমাজকর্মীদের সূতিকাগার এই রাজশাহী কলেজ। বাবার মুখে এসব গল্প শুনতাম আর ভাবতাম আমার কি কখনো সৌভাগ্য হবে এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার?

আমার সেই স্বপ্ন সফল হল ১৯৮২ এ এসে। কলেজে আমার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিল না অবশ্য এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমার। কলেজে ভর্তি হতে গিয়েছি, এসএসসি র সাময়িক সার্টিফিকেট, মার্কশীট, স্কুল থেকে প্রশংসা পত্র সবই নিয়েছি, কিন্তু ভুলে ফেলে গিয়েছি এসএসসি র প্রবেশ পত্র। যে স্যার ম্যাডামেরা ভর্তির দায়িত্বে ছিলেন তাঁরা প্রথমেই প্রবেশপত্র দেখতে চাইলেন। আমি ভুলে ফেলে এসেছি শুনে তাঁরা খুবই ক্ষুব্ধ হলেন। এক স্যার বললেন তাহলে কি তুমি চেহারা দেখাতে এসেছ? একজন ম্যাডাম আমার অন্য সব কাগজপত্র দেখে বললেন যে ছেলেটি কিন্তু খুব ভাল ছাত্র। স্যার বললেন, রাখেন আপনার ভাল ছাত্র, এমন ছাত্র এখানে রাস্তায় গড়াগড়ি যায়। স্যারের কথাটি কিন্তু খুবই সত্যি। প্রথম দিনেই যার সাথেই আলাপ হচ্ছে সেই মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া ছাত্র। যশোর বোর্ড থেকে মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া কিছু ছাত্রের সাথেও পরিচয় হল। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় একদিন একটু আনমনেই হয়তো রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। শহীদ মিনার থেকে বামের রাস্তায় মোড় নেবার সময় একটি ছেলে দ্রুত সাইকেল চালিয়ে এসে ভারসাম্য রাখতে না পেরে আমাকে ধাক্কা দেয়। আমার পায়ে আঘাত লাগে, কিন্তু ছেলেটির আঘাত ছিল বেশি গুরুতর। সে সাইকেল নিয়ে ছিটকে পড়েছিল রাস্তায়। বেশ জখম হয়েছিল। সাইকেলের ক্যারিয়ারে রাখা বই পত্র সব ছড়িয়ে পড়েছিল রাস্তায়। আমি বই গুলো কুড়িয়ে নিয়ে তাকে সাহায্য করেছিলাম উঠে দাঁড়াতে। ওকে সরি বলতেই সে আমার হাত চেপে ধরে বলল কী বলছেন ইমন ভাই, ধাক্কা দিলাম আমি, আর আপনি সরি বলছেন, আমি খুব লজ্জিত। আমি একটু অবাক হলাম, ছেলেটি আমার নাম জানে? বললাম তুমি আমাকে চেন? সে হেসে বলল আপনাকে কে না চেনে ইমন ভাই? এবার আমি প্রমাদ গুনলাম। বদ লোককেই মানুষ চেনে বেশি। বরং ছেলেটিকেই আমার চেনা উচিত ছিল। তার নাম রুহুল। সে আমাদের পরের বছর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিল। রুহুল সাইকেলেই কলেজে আসত। এর পর যতবার দেখা হয়েছে রুহুল সাইকেল থেকে নেমে আমাকে একটা সালাম দিয়ে আবার চলে যেত। এইচএসসি তেও সে প্রথম হয়। তারপর বুয়েটে ভর্তি হবার পর গানের দল রাজনীতি এসবের মাঝে জড়িয়ে পড়ে। পরে বুড়িগঙ্গায় এক ট্রলার ডুবিতে তার মৃত্যু হয়। খবরটি শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। পরম করুণাময়ের কাছে তার আত্মার শান্তি কামনা করি। যা হোক, আবার মূল লেখায় ফিরে আসি। স্যার ম্যাডামরা বললেন যে আমি ভর্তি হতে পারব না যেহেতু আমার প্রবেশপত্র নেই। আমি অনেক অনুনয় বিনয় করলাম যে আমাকে এক ঘন্টা সময় দেয়া হোক, আমি প্রবেশপত্র এনে দেখাচ্ছি। পরে উনারা সম্মত হলেন। আমি দ্রুত বাসায় যেয়ে সেটি নিয়ে এলাম। একজন পিওনের মাধ্যমে সেটি ভেতরেও পাঠালাম। কিন্তু উনারা বললেন যে সবার সাক্ষাৎকার পর্ব শেষ হলে তাঁরা আমাকে ডাকবেন। সকাল থেকেই অভুক্ত অবস্থায় ঠাঁয় বসে রইলাম। বিকেল পাঁচটার দিকে ডাক পড়ল। অবশেষে ভর্তির সুযোগ মিলল। সারাদিন অপেক্ষা করতে খুব খারাপ লেগেছিল, তবে কলেজের এই কঠোর নিয়মানুবর্তিতার কথা ভেবে বেশ গর্ব অনুভব করেছিলাম। এ ভাবেই শুরু হল রাজশাহী কলেজের পথে আমার পথচলা।

আমার বন্ধুভাগ্য বরাবরই খুব ভাল। রাজশাহী কলেজেও এর ব্যতিক্রম হল না। আমি নিজে মানবিক শাখার ছাত্র। আবার বিষয় হিসেবে গণিত পাঠ্য ছিল বলে বিজ্ঞান শাখার ছাত্রদের সাথে ক্লাস করতাম। আর পরিসংখ্যান ক্লাস করতাম মূলত বাণিজ্য শাখার ছাত্রদের সাথে। তাই আমার তখন জগত জোড়া বন্ধু। অসংখ্য মেধাবী মুখ! কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলি। এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকার ২০ এর মধ্যে ১৬ জনই আমার কলেজের। মানবিক আর বাণিজ্য শাখাতেও সেই একই অবস্থা। প্রণব, মিজান, দুলাল, শামীম (Rokshana Parul), লুসি (Irine Banu Lucy), আসিফ (Asif Khan), রাবেয়া, সাইফুল (Saiful Islam), ডানা (Dana Zerina), শামস সুমন, মালা (Shahana Qais Mala), কেয়া (Mahbuba Kaniz Keya) আরও কত উজ্জ্বল সব মুখ। বন্ধু নাফিজ (Mohammad Nafiz), এমি (Quamrul Arif), মন্টুর সাহিত্য আর কাব্য প্রতিভায় আমি ছিলাম দারুন ঈর্ষান্বিত। কলেজে ঢুকতেই একটি ছিপছিপে ছেলের সাথে দেখা হত। মেয়েদের কমনরুমের পাশ দিয়েই ছিল তার নিত্য ঘোরাফেরা। তার সাথে সবসময় ১০/১২ জন ছেলে থাকত। ওরা প্রায়ই মিছিল করত, ‘কানে কানে ফিস ফিস সবাই বল ইবলিশ’ বা ‘ইবলিশের রক্ত লোহার মত শক্ত’। ইবলিশ পার্টির এই নেতা ছিল আমার ঘনিষ্ট বন্ধু সুমন (শামস ইবনে ওবায়েদ), যে পরবর্তীতে শামস সুমন নামে অভিনয় জগতে নাম করেছে। মেয়েদের উত্যক্ত করার ক্ষেত্রে সুমনের জুড়ি ছিল না। রাজশাহী কলেজে পড়েছে অথচ সুমনের উত্যক্তের শিকার হয় নি, এমন কোন মেয়ে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে এর পুরোটাই ছিল নির্দোষ রসিকতা। আর সুমনের হাতে সবচে বেশি উত্যক্ত হয়েছে আমার এমন কিছু বান্ধবী পরে আমাকে বলেছে যে তারা নাকি সেটা রীতিমত উপভোগ করত। হায় রে… একেই বলে নারী চরিত্র… দেবা ন জানন্তি! আমার সাথে অবশ্য সুমনের বন্ধুত্ব গাঢ় হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। সে তখন অন্য এক মানুষ। নিবেদিত প্রাণ সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কর্মী। রাজশাহী কলেজে আমাদের ‘গুরু’ ছিলেন সাইফুল ভাই। বর্ণাঢ্য এক চরিত্র। শুধু তার কাহিনীকে উপজীব্য করে ঢাউস বই লিখে ফেলা যায়। মেয়েদের উত্যক্ত করার যে সব অভিনব পন্থা তিনি আবিস্কার করেছিলেন তাতে তাকে গুরু না মেনে উপায় ছিল না। ১৯৭৫ এ প্রথম বার এসএসসি দিয়ে শেষে ৮২ তে এসে কৃতকার্য হন তিনি। খুব অনিয়ম করতেন, শরীর বলতে ছিল শুধু হাড্ডি আর চামড়া, মাথায় এক বিশাল উইগ পরতেন, দেখার মত। ক্লাসে বসতেন একেবার প্রথম সারিতে। স্যার ম্যাডামেরা পড়ানোর সময় তিনি নানা মন্তব্য করে জমিয়ে রাখতেন ক্লাস। বাংলার হারুনুর রশিদ স্যার তো একবার বলেই ফেললেন, ‘আমার সামনে এটা কি?’ সাইফুল ভাইয়ের তড়িৎ জবাব, ‘আল্লাহর এক উদ্ভট সৃষ্টি।‘ বাংলার বার্ষিক পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল রাজলক্ষ্মীর চরিত্র। সাইফুল ভাই এর এক লাইনের উত্তর, ‘রাজলক্ষ্মী পতিতা, বাইজি, চরিত্রহীনা তাই তাহার কোন চরিত্র ছিল না’। এই উত্তরের জের ধরে প্রিন্সিপালের অফিসে তার তলব হয়েছিল। বন্ধু ইকবাল (বর্তমানে দিনাজপুরের এমপি ইকবালুর রহিম) ছিল আমার খুবই শুভার্থী। সে নিজে রাজনৈতিক পরিবারের ছেলে, কিন্তু আমাকে উপদেশ দিত লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে। অনেকদিন দুপুরে কলেজ হোস্টেলে সে আমার জন্য মিলের অর্ডার দিয়ে রাখত, কিছুতেই পয়সা নেবে না। রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের খাবারের মান বেশ ভাল ছিল তখন, অন্তত রাবি’র হল বা ক্যাফের খাবারের মানের সাথে তুলনা করলে। কলেজে আমার সব অপকর্মের সঙ্গী ছিল আমার খালাতো ভাই টিটু। প্রায় দুপুরেই ওর সাথে চলে আসতাম টিকাপাড়ায় ওদের বাসায়। রাণী খালাম্মা সবসময় আমার জন্য ভাতের চাল দিয়ে রাখতেন। একজন মানুষ যাই রান্না করুক তাই কিভাবে অমন উপাদেয় হয় রাণী খালাম্মার রান্না যে খায় নি সে তা উপলব্ধি করতে পারবে না। টিটু সাংঘাতিক মিষ্টি পছন্দ করত। মাঝে মাঝে বাটার মোড়ে যেতাম ওর সাথে, কখনো এক কেজির নীচে জিলাপি খেতে দেখিনি ওকে। তুলাপট্টির সব্জির চপ, বড় মসজিদের গায়ে লাগানো চায়ের দোকানের চা, জলযোগের লুচি নিরামিশ সন্দেশ, উড়িয়া ঠাকুরের ছানার জিলাপি, রহমানিয়া বা আজাদ হোটেলের কলিজার সিঙ্গাড়া শীষ কাবাব, নিউমার্কেটের খাসির মাংশের চপ সবখানেই আমি আর টিটু। রাজশাহী কলেজের সাথে জলযোগের সম্পর্ক ছিল নাড়ির বন্ধনের মত, আজকের ছেলে মেয়েরা হয় তো জানেও না রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী এই রেস্তোঁরাটির নাম। জলযোগের মত হারিয়ে গেছে আমার ভাই টিটু। নব্বই এর শেষে এক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয় সে। প্রায় পাঁচ বছর কোমায় থেকে সে চলে গেল না ফেরার দেশে তার পরিবারের সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা তার আত্মার চিরশান্তির জন্য।

আমি স্কুলে থাকতেই রাজনীতি করি। রাজশাহী কলেজে আসার পর আমাকে আর পায় কে? যখন আমার বন্ধুরা ক্লাসে লেখাপড়ায় ব্যস্ত, তখন আমি ব্যস্ত রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান দিয়ে বেড়ানোয় বা গাছতলায় গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দেওয়ায়। অনেক সময় এমন হয়েছে যে কোন স্যার হয়তো ক্লাসে যাচ্ছেন বা ক্লাস থেকে ফিরছেন আর আমি গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা করছি, উনি একটু শুনলেন দাঁড়িয়ে, তারপর যথারীতি আমাকে ক্লাসে পেলে রাম একটা ঝাড়ি দিয়ে দিলেন। আমার রাজনীতির গুরু ছিলেন সদ্য প্রয়াত জগলু ভাই (জগলুল আহমেদ)। কোন রাজনীতিক যে তার কর্মীদের অমনভাবে বুকে আগলে রাখতে পারেন জগলু ভাইকে না দেখলে তা বিশ্বাস করা যেত না। উনি আমাকে মিছিল মিটিং এ সবসময় নিরুৎসাহিত করতেন। বলতেন তোর কাজ হল তোর মেধাকে কাজে লাগিয়ে উৎতকর্ষতার শীর্ষে পৌঁছানো। আর এভাবেই দল তোর কাছ থেকে উপকৃত হবে। কিন্তু রাজনীতি তো একরকম নেশার মত, একবার পেয়ে বসলে আর ছাড়ানো যায় না। আর কী স্বাধীন জীবন তখন। যে আমি বাসায় কোন দিন এক কাপ চা খাই নি, সে আমি তখন কলেজ ক্যান্টিনে চায়ের কাপে ঝড় তুলছি। দিন রাত ছুটে বেড়াচ্ছি শহরের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। জগলু ভাই, বিশ্বদা, জাহাঙ্গীর গুরু এদের কাছ থেকে তো অনেক কিছুই শিখেছি। আমাদের সং গঠনের সভাপতি ছিলেন ডিগ্রির ছাত্র কুষ্টিয়ার আতিয়ার ভাই। এমন ভদ্র সাধাসিধা ভালো মানুষ হয়তো সেই সময় বলেই রাজনীতিতে আসতে পেরেছিলেন, শীর্ষ পদে গিয়েছিলেন। আজকের দিনে তাঁর মত মানুষ নিঃসন্দেহে রাজনীতিতে অপাংক্তেয়। মাঝে মাঝে ফারুক লাইব্রেরীতে জম্পেশ আড্ডায় বসে যেতাম কাইয়ুম ভাই আর মিনু ভাই এর সাথে। আমরা তিন জন তিন মতের মানুষ- কিন্তু কী সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কই না ছিল আমাদের মাঝে। কাইয়ুম ভাই তো আমার গুরু সব সময়েরই… আমি তখন বার্মিংহামে পিএইচ ডি করি, মিনু ভাই রাজশাহীর মেয়র। উনি মেয়রদের সম্মেলনে বার্মিংহামে গেছেন, আমি জানতামও না। কিন্তু উনি ঠিকই খুঁজে বের করেছেন আমাকে। পরে আমাকে বললেন শহরের সুন্দর কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখাতে। উনাকে নিয়ে গেলাম আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে, এজবাস্টন ক্রিকেট মাঠে। International Convention Center এর সামনের রাস্তার ডিজ়াইন দেখে উনার এত পছন্দ হল যে কিছু ছবি তুলে নিলেন। পরে রাজশাহীর নগর ভবনের ডিজাইনে তার অনেকটা ছাপ আমি লক্ষ করেছি।

যার জন্য কলেজে আসা সেই লেখাপড়াই ছিল আমার অগ্রাধিকার তালিকার সবার নীচে। কিছু কিছু ক্লাস ছিল অসীম বিরক্তির। যেমন আমাদের এক ইংরেজি স্যার (নামটা না হয় নাই বলি) কবিতা পড়াতেন। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে Ulysses কবিতাটি আকারে বেশ বড়। প্রায় তিন মাস ধরে তিনি শুধু কবিতাটির প্রথম পাতাই পড়ালেন। আজ যেখানেই শেষ করুন না কেন, পরদিন আবার প্রথম থেকে পড়ান। একদিন আমার এক সহপাঠী বিনয়ের সাথে বলল যে স্যার আমাদের সিলেবাসে তো অনেক কিছু আছে, আপনি সেগুলো কবে পড়াবেন? উনি রেগে গিয়ে বললেন, ‘মুর্খ, তুই জানিস Ulysses এমন একটা কবিতা যা বছরের পর বছর ধরে পড়ানো যায়?’… পরে একদিন বললেন ‘পড়া ক্লাস রুমে হয় না, হয় বাইরে… আর যারা পরীক্ষার দুই মাস আগে পড়তে আসবে তারা ‘আসল’ সাজেশন পাবে না। আসল সাজেশন পেতে হলে পড়তে হবে এখন থেকেই’… ইঙ্গিতটা খুব স্পষ্ট। আমি তো এমনিতেই প্রাইভেট পড়ি না, এই ঘটনার পর ক্লাস করাও বাদ দিলাম। তবে এটি ছিল একদম ব্যতিক্রমী ঘটনা। বেশিরভাগ ক্লাসই ছিল উপভোগ্য। ইংরেজিতেই অসাধারণ পড়াতেন খালেক স্যার। জলিল স্যার, শহিদুর রহমান স্যার, আমীর আলী স্যার ভাল পড়াতেন। খুব উপভোগ করতাম দীন মোহাম্মদ স্যারের ক্লাস। স্যার প্রায়ই সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রশ্ন করতেন। এই বিষয়টি ছিল আমারও খুবই প্রিয়। স্যার আমার উত্তর শুনে মাঝে মাঝে উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার প্রশংসা করতেন। বলতেন শুধু বই মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাওয়া যায় বটে তবে তাতে জ্ঞান অর্জন হয় না। ছাত্র হতে হবে ইমনের মতন। বাংলা নিয়ে আমি বরাবরই বিব্রত থাকতাম। হাবিবুন্নবী স্যার ছিলেন আমার বাবার সহপাঠী, আর বাকি সবাই ছিলেন বাবার সরাসরি ছাত্র ছাত্রী। হাবিবুন্নবী স্যারের ক্লাস একদিন ফাঁকি দিয়েছি, পরদিনই বলেছেন, কি রে মোল্লার ব্যাটা, চোখ ফুটে গেছে, তোর বাপকে বলছি দাঁড়া… হারুন স্যারের কথা আগেই বলেছি। অসাধারণ পড়াতেন ফরিদা সুলতানা ম্যাডাম। সাইফুল ভাই সব ম্যডামের ক্লাসেই একটু বিশেষ ক্যারিশমা প্রকাশ করতেন। কিন্তু ফরিদা আপা প্রথম রাতেই বিড়াল মেরে দিলেন। সাইফুল ভাইকে খুব শান্ত কিন্তু কঠোর কন্ঠে বললেন, চাবকে তোমার পিঠের চামড়া তুলে দেব। সঙ্গে সঙ্গেই অফ হয়ে গেলেন গুরু আর আমরা শিষ্যরাও বুঝে গেলাম যে এই ম্যাডামের ক্লাসে নো বাঁদরামি। অর্থনীতিতে মাসুম স্যার, আনসার স্যার, মজিদ স্যার সুশিক্ষক ছিলেন। তবে আমি বেশি উপভোগ করতাম সুভাষ স্যারের ক্লাস। স্যারের নামের সাথে একটা ‘বিশেষন’ যুক্ত ছিল। কবে কিভাবে তা যুক্ত হয়েছিল জানি না, তা নিয়ে এন্তার কেচ্ছা কাহিনীও ছিল, তবে অসাধারণ পড়াতেন তিনি। আমার নিয়মিত লাইব্রেরি করার ‘বদভ্যাস’ ছিল। ক্লাস করি বা নাই করি, ২ টা থেকে ৫ টা আমি নিয়মিত লাইব্রেরিতে কাটাতাম। রাজশাহী কলেজ লাইব্রেরী ছিল খুবই সমৃদ্ধ। এমন অনেক বই যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে মিলত না তা পাওয়া যেত এখানে। আমার প্রিয় তিনটি বিষয় ইতিহাস, দর্শন আর অর্থনীতির খুব সমৃদ্ধ সংগ্রহ ছিল এখানে। স্যারকেও নিয়মিত লাইব্রেরি করতে দেখতাম। আমি অর্থনীতিতে পড়ব যেনে স্যার খুব উৎসাহ দিতেন। পরিসংখ্যান বিভাগে মোজাম্মেল স্যার তখন কেবল জয়েন করেছেন। আসাদ স্যারের কাছে তেমন পড়ি নি। তবে পরিসংখ্যানে কিংবদন্তির শিক্ষক ছিলেন লতিফ স্যার। কত সহজে যে একটা কঠিন বিষয় পড়ানো সম্ভব তা স্যারের কাছে যে না পড়েছে সে বুঝবে না। স্যারের কাছে পড়ার পর আবার কেন প্রাইভেট পড়তে হবে এটা ছিল আমার বোধের অগম্য। আমি যে শেষ পর্যন্ত পরিসংখ্যান বিষয় হিসেবে পড়েছি তাতে নিঃসন্দেহে লতিফ স্যারের পরোক্ষ প্রভাব আছে। তবে পরিসংখ্যানকে তখন কেউ গুরুত্বের সাথে নিত না । প্রায় সবারই এটা ছিল চতুর্থ পত্র, অল্প পরিশ্রমে অনেক নম্বর পাওয়া যায়, মূলত এই ভাবনা থেকেই সবাই পরিসংখ্যান পড়ত। আমার অবশ্য চতুর্থ পত্র ছিল যুক্তিবিদ্যা। একজন ম্যাডাম খুব ভাল পড়াতেন, কিছুতেই তাঁর নাম মনে করতে পারছি না, সম্ভবত রোজি বা ডেইজি এমন একটা নাম ছিল তাঁর। এক্ষেত্রেও কিংবদন্তির শিক্ষক ছিলেন মল্লিক স্যার। অকৃতদার এই মানুষটি থাকতেন ফুলার হোস্টেলের পাশেই। তাঁর বাসায় ছেলেমেয়েদের ভিড় লেগেই থাকত। তিনি সবসময়ই প্রাইভেট পড়াতেন তবে কারো কাছ থেকেই পয়সা নিতেন না। আমি স্যারের কাছে কখনো পড়তে যাই নি, তবে গিয়েছি বাবার জন্য ওষুধ আনতে। তিনি শখের হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ছিলেন এবং তাঁর ওষুধে বাবার অনেক অসুখ সেরেও গিয়েছিল। বাসায় গেলেই দেখতাম যে দল বেঁধে ছেলে মেয়েরা আছে। মেয়েরা রান্না করছে, স্যারকে খাওয়াচ্ছে, নিজেরা খাচ্ছে- যেন নিজেদের বাড়ি। বাবার কাছে তাঁর নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের যেসব গল্প শুনেছি সম্ভবত তার শেষ সংস্করণ ছিলেন আমাদের মল্লিক স্যার।

মানুষের জীবনে আনন্দের উলটো পিঠেই থাকে দুঃখ, হাসির ভেতরেই লুকানো থাকে কান্না- এভাবেই হাসি আনন্দ দুঃখ বেদনার ভেতর দিয়েই কেটে গেছে আমার দুই বছরের রাজশাহী কলেজ জীবন। কালের পরিক্রমায় সেই দুঃখ বেদনাগুলোও ক্রমশ হয়ে উঠছে সুখস্মৃতি। এই জীবনে কিছু হারিয়েছি সত্য, কিন্তু প্রাপ্তি তার থেকে অনেক বেশি। জীবনকে যদি বলি এক মহাকাব্য তবে তার উজ্জ্বল একটি অধ্যায় আমার রাজশাহী কলেজ জীবন, পরতে পরতে জড়িয়ে আছে তার স্মৃতি। যুগ যুগ জীও… আমার প্রিয় রাজশাহী কলেজ… এভাবেই আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাও তরুণ প্রজন্মকে অনন্তকাল…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

×