আজকের নয়নগোচর ঘটনাপুঞ্জ কালপ্রবাহে মিলিয়ে যাবে। স্মৃতি সব ঘটনা ধরে রাখে না। অথচ অনেক তুচ্ছাতিতুচ্ছ যোজনা অবিকল হয়ে স্মৃতির দুয়ারে হানা দেয়। প্রায় অশিতিবর্ষের জীবন মোহনার প্রান্তে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের কথা ধার করে নিয়ে বলতে হয় : ‘চিত্ত ভরিয়া রবে ক্ষণিক মিলন’ রাজশাহী কলেজের কিছু স্মৃতি।
তদানীন্তন পাকিস্তানের (আরোপিত!) প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাজশাহী আগমন করলে আমার বড়ো ভাই জি.কে.এম. শামসুল হুদাকে (মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক) আমার আব্বা রাজশাহী নিয়ে এসেছিলেন রাজদর্শনে, (সম্ভবত পুণ্যলাভের আশায়)। তখন ১৯৫০ সাল। আমি কৈশোরের সীমানায়। আমাকে সাথে নিয়ে না আসায় আমার মনের কষ্ট দূর করতে সে বছরই আমাকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন আমার আব্বা, তাঁর বন্ধুর মোহনপুরের মহব্বতপুরের বাড়ি। যেতে হয়েছিলো রাজশাহী হয়ে। লেখাবাহুল্য, সেই আমার প্রথম রাজশাহী দর্শন। সে সব স্মৃতি আজ ধূসর হয়ে গেছে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী রাজশাহী আগমন করলে সদ্য কৈশোরে উত্তীর্ণ সমবয়সীদের সঙ্গে ট্রেনযোগে রাজশাহী আসি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা ছিলো সীমিত ডেলিগেটের সামনে। সাধারণ জনসভা নয় বলে বক্তৃতার আয়োজন করা হয় মাদ্রাসা ময়দানের পাশে তখনকার জিন্না হলে। এখন সে-নামের বহুপরিবর্তন হয়েছে। মুসলিম ছাত্রলীগের রাজশাহীর মুখপাত্রের সাথে পূর্ব পরিচয়ের সুবাদে আমি ডেলিগেট কার্ড পেয়েছিলাম। জ্ঞাতার্থে বলে রাখি, মুখপাত্রটি ছিলেন দেবিনগর হড়মা গ্রামের ইয়াসিন আলী। সিপ্লেনে প্রধানমন্ত্রীর আগমন বিলম্বিত হবার কারণে ডেলিগেট সভায় দীর্ঘ বক্তৃতা করেন বাসুদেবপুরের এডভোকেট মজিবর রহমান। উল্লেখ্য, পরবর্তীকালে আইউব খানের ‘প্রভু নয় বন্ধু’ বইটির জবাবে তিনি ‘বন্ধু নয় শত্রু’ নামের একখানা বই লিখেছিলেন। তিনি একদা রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মাদ্রাসা ময়দান সভাস্থলে যাত্রা পথে রাজশাহী কলেজ প্রশাসন ভবন দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হই। তবে ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ হয়নি সেদিন।
১৯৫৭ সালে আবার রাজশাহী আসি বাল্যসহচর সাজাহানকে সাথে নিয়ে। সারাদিন ঘোরার পর রাত্রিযাপনের আশ্রয় মিলে রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের এ ব্লকে (এখন যার নাম বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ভবন)। সেখানকার আবাসিক ছাত্র আমাদের প্রতিবেশী চাঁপাইনববাগঞ্জের নয়ানশুকার তামিজ মিয়ার ছেলে মতিউর রহমান। তিনি ডিগ্রিতে পড়তেন। এমন সুরম্য প্রাসাদতুল্য ভবনে রাত কাটাবার সেই ছিলো আমার জীবনে প্রথম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি আরো কয়েকটি ব্লকে আবাসিক ছাত্রদের অবস্থান। রাত নটার পর দেখা গেল নিস্তব্ধ নীরবতা। মনে হলো যেন যুগান্তরের সাগর কল্লোলকে কোন জাদুবলে জ্ঞান তপস্যায় মগ্ন করে রাখা হয়েছে। সকালে ঘুম ভাঙলো পাশের কক্ষের মতিউর ভাই এর সহপাঠী হাবিবুর রহমানের দরাজকণ্ঠে গাওয়া ‘পাষাণের বুকে লেখনা আমার নাম’ গানটি শুনে। উল্লেখ্য, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া এ গানটি ঐ সময়ে তরুণদের চিত্ত আকর্ষণ করতো। হাবিব ভাই এর বাড়ি ছিলো বগুড়া শহরে। বেলা আটটার দিকে ঠাকুর সকালের নাস্তা দিয়ে গেলেন কলাপাতায় মুড়ে। মৌ মৌ সুঘ্রাণ ছড়ানো খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি, মিষ্টি আর তরকারি। এটা ছিলো তাদের নিত্যদিনের সকালের সাধারণ নাস্তা। অথচ আমার মনে হলো যেন রাজভোগে আমন্ত্রিত হয়েছি।
নাস্তা খাওয়া শেষে ছাত্রাবাসের বিভিন্ন ব্লক দেখলাম। নবাবগঞ্জ ফেরার ট্রেনের সময় হয়ে আসলো। ঘোড়াগাড়িতে রেলস্টেশনে চলে আসলাম। রাজশাহী কলেজের মূল ভবনগুলো দেখার অতৃপ্তি রয়ে গেল। তখন থেকে সংকল্প নিয়েছিলাম, রাজশাহী কলেজে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন না করে কলেজ চত্বরে প্রবেশ করবো না। (তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময়েও এ মুখো হইনি।) মনে হবে এটা অবাস্তব সংকল্প! সত্যি তাই। তখন আমি মাদ্রাসার ছাত্র। সুদৃঢ় সংকল্পের শক্তিতে মাদ্রাসার পাঠ শেষে কেঁচেগন্ডুষ করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ সংগ্রহের পর তখনকার পূর্ব পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনে পরীক্ষা দিয়ে সরকারি কলেজে পড়ানোর সুযোগ পেলাম। দুর্ভাগ্য, প্রথম নিয়োগ হলো আমার স্বপ্নের অগোচর নোয়াখালী সরকারি কলেজে। স্মৃতির অলিন্দে জেগে রইলো রাজশাহী কলেজের অনিন্দ্যস্মৃতি। এখনকার দিনে রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি অথবা নগদনারায়ণের শক্তিতে রাজশাহী কলেজে আসা যায়। গতশতকের আশির দশকের দিকে যার হিড়িক পড়েছিলো।
নোয়াখালী সরকারি কলেজে যোগদানের কিছুদিনের মাথায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। বন্দিদশা থেকে মুক্তির পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। ছাত্রজীবনে বাঙালির স্বাধিকার চেতনার সাথে সম্পৃক্ত থাকার পরেও চাকরি ছেড়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হয়নি। নোয়াখালীতে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে নিঃশ্বাস নিতে প্রায় পায়ে হেঁটে বন্ধুরপথে তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে এসে পড়লাম। জীবন বিপন্ন হয়ে উঠলো। আমার আব্বার বন্ধু রাজশাহীর অ্যাডিশনাল কমিশনার আব্দুর রব খানের সাথে পরামর্শক্রমে জানা গেল, তখনকার ডি.পি.আই. ফেরদৌস খানের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা আছে। তিনি তাঁকে লিখলেন। মুক্তিযুদ্ধের ক্লাইমেক্সের দিনে আমি নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে রাজশাহী কলেজে বদলির আদেশ পেলাম। এ যেন ‘স্বপ্নলোকের চাবি’ হাতে পাওয়া। একাত্তরের আগস্টের তেরো তারিখে কলেজ থেকে নির্মুক্ত হয়ে পাকিস্তানের স্বাধীনতাদিবসে নোয়াখালী থেকে রওয়ানা হয়ে ভাঙা ভাঙা পথে জীবন হাতে নিয়ে সতেরোই আগস্ট নবাবগঞ্জ পৌঁছলাম, তখন নবাবগঞ্জ বন্যায় ভাসছে। তবে আমার মনে তখন বিরুদ্ধ পরিবেশেও অনাস্বাদিতপূর্ব বিপদময় আনন্দের বন্যা। নিয়মানুযায়ী সময় হাতে থাকলেও মৃত্যুর বিভীষিকার মধ্যে, রাজশাহী কলেজে যোগদান করলাম একুশে আগস্ট শনিবার। মনে হলো এবার মরণ যদি হয় তবে তা হবে ‘সরগ সমান’।
রাজশাহী কলেজে যোগদানের সময় বাংলার শরৎ ঋতু শুরু হয়ে গেছে। কলেজ সিংহদ্বার দিয়ে প্রবেশের ঐ মহাদুর্যোগের দিনে মনে হতে লাগলো ‘হৃদয়ে ছিলে জেগে, দেখি আজ শরৎ মেঘে।’ প্রায় শতবর্ষ বয়সী প্রশাসন ভবনটি তখনো যৌবনের শেখরে। আমার অভিজ্ঞতায় বলে স্থাপত্য শৈলীর এমন ভবন কাছে দূরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আছে কিনা তা জানা নেই। আজ সার্ধশতবর্ষ বয়সে পৌঁছলেও বর্তমান প্রিন্সিপাল মহা. হবিবুর রহমানের ক্লান্তিহীন কর্মযজ্ঞে রাজশাহী কলেজের সবকিছু অনন্ত যৌবনা উর্বশীর মতো। কবি তরাফার কথা দিয়ে বলতে হয় ‘ওয়াল বিলাদো কামাহুয়া’।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় অংশ নিলেও তখনকার স্বজনহীন রাজশাহী শহরে প্রাথমিক অবস্থানের দুর্ভাবনার অবসান ঘটালেন পদার্থবিদ্যার গুণীশিক্ষক জনাব আব্দুল গনি। দুদিন তাঁর বাসায় আতিথ্যের পর পাঠানপাড়ায় নূরুল ইসলামের বাসা ভাড়া নেয়া হলো। সঙ্গে ছিলেন কেমিস্ট্রির বজলুল করিম, আব্দুস সালেক ও ফিজিক্সের আব্দুস সালাম। এঁরা দখলদার সরকারের অ্যাডহক নিয়োগপত্র নিয়ে রাজশাহী কলেজে যোগদান করেছেন তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার ইয়ারমেট।
পাঠানপাড়ার দক্ষিণে পদ্মার বাঁধের পুরোটাই তখন দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর ট্রেঞ্চ। মাঝেমাঝে সেখানে মুক্তিবাহিনীর শেল পড়ে। আমরা সবাই আকৃতদার হলেও জীবনের ভয় কার না থাকে! রাজশাহী কলেজ নিউ হোস্টেলের তত্ত্বাবধায়ক তখন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক বেলায়েত আলী। তিনি তাঁর ছাত্রবিহীন হোস্টেলে সাময়িকভাবে অবস্থানের অনুমতি দিলেন। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সাদেক আলী সাহেব তিনতলায় সপরিবারে অবস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। কদিন পরে গণিতের অধ্যাপক জনাব জায়েজ উদ্দিন এবং ইংরেজির অধ্যাপক জনাব গোলাম মোস্তফা আমাদের সাথে থাকতে লাগলেন। অক্টোবরের মাঝামাঝি মাহতাব নামের এক বাংলার শিক্ষক অ্যাডহক নিযুক্তিপত্র পেয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হলেন। তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হয়ে গেছে। সারাদিন কলেজ চত্বরে কাটিয়ে সন্ধ্যায় আস্তানায় ফিরে এসে রাতের জন্য অপেক্ষা করি। দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে কানের কাছে স্পিকার রেখে স্বাধীন বাংলার অনুষ্ঠান শুনি। মন থেকে অনেক হতাশা কেটে যায়। আবার কলেজে গিয়ে কিছু শিক্ষকের অযৌক্তিক পাকিস্তানপ্রীতি আর আলবদরের সশস্ত্র মহড়ায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ি।
আবার একটু পেছনে ফিরে দেখি।
রাজশাহী কলেজ সিংহদার দিয়ে প্রবেশ করে প্রশাসন ভবনের সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইউনুস আলী দেওয়ানের সাথে দেখা। পরবর্তী সময়ে তিনি রাজশাহী কলেজের প্রিন্সিপাল, নায়েমের ডিজি হবার পর অবসরে যান। এখন জীবন থেকে অনন্ত অবসরে। তিনি প্রথমে আমাকে প্রধান সহকারি আব্দুল ওয়াহাবের কাছে নিয়ে যান। ওয়াহাব সাহেব নোয়াখালীর মানুষ রাজশাহী শহরের পাঠানপাড়ায় থিতু হলেও নোয়াখালীর প্রতি গভীর টানে আমাকে উষ্ণ সহায়তা করলেন। তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে প্রিন্সিপাল মহোদয়ের কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন। প্রিন্সিপাল ড. শামসুদ্দীন মিয়া একা বসেছিলেন। স্বল্পবাক রাশভারী প্রিন্সিপাল সাহেব বিস্মিত হলেন এই ভেবে যে সেই মহাদুর্যোগে কোন মন্ত্রবলে দুস্তর পথ পাড়ি দিয়ে আমি রাজশাহী এসেছি। ঝর্ণা যেমন উপলখণ্ডের শতবাধা অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছে। আমিও তেমনি আমার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন চরিতার্থের জন্য সদা অপঘাত মৃত্যুর আশংকা উপেক্ষা করে রাজশাহী কলেজ আসি।
যোগদানপর্ব শেষ হলে প্রিন্সিপাল ড. শামসুদ্দীন মিয়া আমার করণীয় সম্পর্কে সংক্ষেপে নির্দেশনা দিলে আমি তাঁর অনুমতি নিয়ে শিক্ষকবৃন্দের বসার ঘরে চলে আসি। বসার ঘরে আসার পর রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার পর অসামান্য কিছু ব্যক্তির পদধূলিতে কীভাবে এই মাটি ধন্য হয় তার পূর্বাপর ইতিহাস আমার চেতনায় ভর করলো।
নাটোর নওগাঁর রাজন্যবর্গের উদ্যোগে ১৮৭২ সালে রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার পরের বছর বাউলিয়া ইংলিশ স্কুলকে সামনে রেখে ঐ রাজা-জমিদার এবং স্থানীয় কিছু শিক্ষানুরাগী ব্যক্তর প্রচেষ্টায় ১৮৭৩ সারে রাজশাহী কলেজ তার পদযাত্রা শুরু করে। উল্লেখ্য, বাউলিয়া স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল ১৮২৮ খ্রীস্টাব্দ। কালক্রমে যার নাম আজকের কলেজিয়েট স্কুল। আমি যোগদান করার সময় রাজশাহী কলেজের বয়স প্রায় শতবর্ষ। এ কলেজে পায়ের ধুলো রেখেছেন অনেক মনীষী। রবীন্দ্রনাথের রাজশাহীতে আগমন ১৮৯২ সালের ১২ই নভেম্বর। রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশনের বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিবর্গের অনুরোধে বিদ্বজন ব্যক্তিমণ্ডলীর উপস্থিতিতে ‘শিক্ষার হেরফের’ নামের একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন রবীন্দ্রনাথ। শতবর্ষ অতিক্রান্ত হলেও যার আবেদন আজও ফুরায়নি। লেখাবাহুল্য এ সময়ে রাজশাহী কলেজে বাংলা, ইংরেজি, আরবি, দর্শন, অর্থনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন শাস্ত্র এবং গণিত বিষয়ে অনার্স পঠন পাঠন শুরু হয়ে গেছে। তখন থেকেই রাজশাহী কলেজকে কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের সমতুল্য ভাবা হতো। ১৮৯২ সালে রাজশাহী কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন ও.ঊ.ঝ. ডাব্লু. বি. লিভিংস্টোন এবং রাজশাহীর জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথের বন্ধু এবং বিলেতে কিছুদিনের সতীর্থ বর্ধমানের লোকেন্দ্র নাথ পালিত। এই সুযোগে রাজশাহী কলেজের প্রিন্সিপালের বাসভবন সম্পর্কে একটি তথ্য বলে রাখি। তখন রাজশাহী শহরে দুটি একই রকমের সুদৃশ্য বাসভবন নির্মিত হয়। একটি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টরের জন্য অপরটি রাজশাহী কলেজের প্রিন্সিপালের আবাসগৃহ। ভাবতে অবাক লাগে, রাজশাহী কলেজের প্রিন্সিপালের মর্যাদা শতবর্ষেরও আগে কী মহিমান্বিত ছিলো! শিক্ষক মিলনায়তনে এতসব সাতপাঁচের চেতনাপ্রবাহ একসময়ে স্বগতোক্তিতে রূপান্তরিত হলো। কিছু শিক্ষকের সামনে আমি বলেই ফেললাম: নিবিড় জ্ঞান সমুদ্রের সৈকতে বসে নিজেকে বেমানান মনে হচ্ছে। এখানে বসার সামান্য যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কালপ্রবাহ আমাকে এখানে ঠেলে দিয়েছে। জনৈক শিক্ষক আমার বিনম্র উক্তিকে প্রকান্তরে দাম্ভিকতা বলে মন্তব্য করলেন। তিনি এখনো জীবিত। তাই তার নাম উল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম। স্মর্তব্য তখন রাজশাহী কলেজের উপাধ্যক্ষ ছিলেন সিলেট নিবাসী ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক জনাব আব্দুল খালেক। তিনি ছিলেন শিশুর মতো সরল এবং নিরহংকার। আমি নোয়াখালী কলেজ থেকে বদলি হয়ে এসেছি, একথা শোনার পর তিনি উদ্বেলিত হয়ে বললেন, নোয়াখালী কলেজের প্রিন্সিপাল দেওয়ান মোহাম্মদ আহম্মদ চৌধুরী তাঁর অঞ্চলের মানুষ এবং উভয়েই আসাম শিক্ষাসার্ভিসের সদস্য।
দুপুর গড়ার আগেই ফুলার ভবনে বাংলা বিভাগে গেলাম। প্রায় শতবর্ষবয়সী একখানা অভিজাত গোলাকার বড় টেবিল সামনে রেখে বিভাগীয় প্রধান আব্দুল লতিফ চৌধুরী বিষণ্নবদনে বসে আছেন। আমাকে দেখে কিছুটা প্রসন্ন হলেন। উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস তাঁর নখদর্পনে। অথচ বিনয়ের অবতার।
কলেজ প্রাঙ্গণ-যেন দিবানিদ্রামগ্ন। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম। উচ্চ মাধ্যমিকে উপস্থিতির সংখ্যা বেশি। রীতিমত ক্লাস হয়। ডিগ্রিপাস ও অনার্সে উপস্থিতি নগন্য। প্রতিমুহূর্তে বিভীষিকা মূর্ত হয়ে তাড়া করে। ভয় হয় কখন বদর বাহিনীর নির্মম সদস্যরা কৃত্রিম পাকিস্তান রক্ষার জোশে আমাদের মতো নিরীহ শিক্ষককে বলির জন্তু করে ধরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি জল্লাদ হায়েনাদের হাতে তুলে দেয়। এভাবেই দুঃসহ দিন রাত্রি যাপিত হয়। এ সময়ে পাঠ্য তালিকার রবীন্দ্রনাথের কবিতা-গদ্য পড়াতে অনেকেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। আমি পিছিয়ে থাকিনি। কখনো আমি কবি-সাহিত্যিকদের ধর্ম আর ভাষার বৃত্তে বেঁধে রাখিনি। আজো তা অক্ষুন্ন।
রাজশাহী কলেজে একদশক পঠন-পাঠনে নিযুক্ত থাকার সময়ে (১৯৭১-১৯৮১) আমার বিস্ময়ের অবধি ছিলো না, উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের প্রতিভার দীপ্তিতে। কলেজটি প্রতিষ্ঠার পর দেশভাগের পূর্বপর্যন্ত এর গৌরব ছিলো ভারত জোড়া। উচ্চ মাধ্যমিক থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী আর শিক্ষকের সমাবেশ ছিলো অতুলনীয়। দেশভাগের পর অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী দেশান্তরিত হলে কিছু সময়ের জন্য কলেজ থমকে দাঁড়ায়। প্রিন্সিপাল ড. মমতাজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে কলেজ তার পূর্বাবস্থা ফিরে পেতে থাকে। আগেকার দিনে কলেজে ভর্তি হলে অধিকাংশ ছাত্রী শাড়ি পরতো। শংকিত তরুণীরা পকিস্তানি সেবাদাসদের খুশি করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শালোয়ার-কামিজ ধরেছিলো। দেশ স্বাধীন হলে আবার তারা বাঙালি ঐতিহ্যে ফিরে আসতে থাকে। এখন কোন সংস্কৃতির অনুকরণ করে, তা নির্ণয় করা কঠিন।
বলছিলাম, পাঠানপাড়ার নূরুল ইসলাম সাহেবের বাসা ছেড়ে দিয়ে কলেজের নিউব্লকে আমরা কজন শিক্ষক আস্তানা গেড়েছিলাম। সময় যত যায়, ততই আশা-আশংকা সমানভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। প্রিন্সিপাল ড. শামসুদ্দিন মিয়া এবং পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক লুৎফুর রাহমানকে পাকিস্তানি জজবার ঘাতক-দোসরদের প্ররোচনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বধ্যপুরী জোহা হলে নিয়ে যায়। তখন একাত্তরের নভেম্বর মাস। পাকিস্তানি হায়েনারা পরাজয় নিশ্চিত জেনে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য। আমরাও প্রবলভাবে শংকিত। প্রিন্সিপাল ড. শামসুদ্দীন মিয়া এবং অধ্যাপক লুৎফুর রাহমান আয়ু ফিরে পেয়ে কলেজে আসেন। তাঁদের কণ্ঠরুদ্ধ। পাকিস্তানি ভাবাপন্ন কিছু শিক্ষক যারা প্রিন্সিপালকে ঘিরে সুবিধা আদায়ের মতলবে থাকতেন, তাদের অনেকে তাঁর সাহচর্য থেকে দূরে সরে যান। অনেকেই রাজশাহী ছাড়েন। আমি বুদ্ধিজীবী হত্যাদিবসের আগের দিন রাজশাহী ছেড়ে দুর্গম বরেন্দ্র অঞ্চলে আত্মগোপন করি। দেশ স্বাধীন হলে কলেজে ফিরে দেখি, কিছু স্তাবক শিক্ষক প্রথম শ্রেণির মুক্তিযোদ্ধা সেজে আসর মাত করছেন। হায়! এমনটিই বোধকরি ইতিহাসের কলংকময় পুনরাবৃত্তি।
১৯৭১ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত রাজশাহী কলেজে (আমি ব্যতীত) এক ঝাঁক মেধাবী শিক্ষকের সমাবেশ ঘটেছিলো। বাংলাদেশে ঐ সময়ে অনেক ভাঙাগড়া এবং ইতিহাসের জঘন্য দৃশ্য সংঘটিত হয়েছে। লক্ষ্য করেছি ‘৭৫’এর জাতীয় ট্র্যাজেডির পর কৃত্রিম স্বাধীনতার পক্ষের শিক্ষক রাতারাতি ক্ষমতা দখলকারিদের বলয়ে চলে যান।
দুঃখ হয়, একাত্তরে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যারা ঘোর-পাকিস্তানি সেজে অ্যাডহক নিয়োগপত্র নিয়ে রাজশাহী কলেজে এসেছিলেন, বঙ্গবন্ধু যাদের প্রতি দয়া দেখিয়ে নিয়মিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারাই আবার নিদারুণ বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষী হয়ে উঠলেন। এসব কতিপয় ছাড়া রাজশাহী কলেজের শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন শিক্ষাব্রতী নিবেদিত প্রাণ। কাকে ছেড়ে কার নাম করবো, আজ জীবনের সায়াহ্নবেলায় ভাবি, শিক্ষকতার মতো মহানব্রতে আমার মতো ব্যক্তির জ্ঞান সাগরের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে বিস্ময়াভিভূত হওয়া ছাড়া শিক্ষক সাজা উচিত হয়নি।
যাদের উপস্থিতি এবং পদসঞ্চালনে রাজশাহী কলেজ অনন্য হয়ে দেশবাসীর সামনে সগৌরবে ঘোষণা করছে, একদা আমরা ছিলাম এবং এখনো আছি, সেইসব শিক্ষার্থী সম্পর্কে কিছু বলা আবশ্যক মনে করছি। আমার মতো তখনকার মাদ্রাসা পড়ুয়া মেধাহীন ব্যক্তির পক্ষে রাজশাহী কলেজের অতুল মেধাবীদের যাচাই নীতিজ্ঞান বহির্ভূত। তবুও বলবো, তখনদার দিনের শিক্ষার্থীবৃন্দ, বিশেষ করে উচ্চ মাধ্যমিকের প্রত্যুৎপন্নমতি জ্ঞানপিপাসুদের ক্লাসে প্রশ্ন জিজ্ঞাসার আশংকায় সদা সতর্ক থাকতাম। প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে না পারলে, শিক্ষক হিসেবে দাঁড়াবার অধিকার খর্বিত হয় বলে মনে করতাম।
একটা কথা সবসময় ছাত্রদের বলতাম, আমি যা বোঝানোর চেষ্টা করি, তা যদি তারা আয়ত্ত করতে পেরে থাকে তবে সেটা তাদের মেধারগুণে, তা না হলে সেটি আমার অক্ষমতা দায়ী। তাছাড়া তাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনে যতটুকু আপ্লুত হয়েছি, তা তাদের সদাচারের বহিঃপ্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন ‘বিদ্যা আহরণের শিক্ষা আচরণের’। আমার বিশ্বাস ছিলো মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেনম বিদ্যা আহরণে পারদর্শী, তেমনি আচরণ প্রদর্শনে প্রশংসার্হ। আজো সে বোধ আমার অক্ষুন্ন।
এমন একটা বয়সে শিক্ষার্থীরা কলেজে আসে যখন তাদের অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার পরিসীমা থাকে না। তাই অনেক সময় তারা সীমালংঘন করতে পারে এবং শ্রেণিকক্ষে অসদাচারণে লিপ্ত হয়। আমি লক্ষ্য করেছি মেধাবী শিক্ষার্থীদের দুষ্টামির এমন একটা আর্ট ছিলো যা উপভোগ্য। নিজেকে সেই বয়সে দাঁড় করিয়ে সহমর্মী হলে ভালো ফল পাওয়া যেত। আসলে মেধাবীরা নতুন নতুন উপলক্ষ তৈরি করে অকারণ আনন্দ উপভোগ করতে চায়। তাই বলে সব সুযোগ তাদের দেইনি। পাঠ্যবিষয় এবং পাঠবহির্ভূত জ্ঞানমিশ্রিত রসের বিষয় পরিবেশিত হলে, বয়স এবং অবস্থা যাই হোক, তাদের কাছে থেকে শিক্ষার্থীসুলভ আচরণ পাওয়া কঠিন হয়নি। জানি না, আমার তখনকার শিক্ষার্থীরা তা কীভাবে গ্রহণ করেছিলো।
এখনকার রাজশাহী কলেজ সব দিক থেকে শীর্ষতার শিখরে উন্নীত। কলেজের সর্বত্র নবীন বসন্তের পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ। এর মূলে রয়েছে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকবৃন্দ ও সদাজাগ্রত উপাধ্যক্ষকে সাথে নিয়ে প্রিন্সিপাল মহা. হবিবুর রহমানের নিরলস কর্মসাধনা। উদ্যোক্তাদের কাণ্ডারী হয়ে রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের মহামিলনের এই অভূতপূর্ব আয়োজন তাঁর কর্মযজ্ঞের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আমার শিক্ষকতা জীবনের স্বর্ণময় অধ্যায় রাজশাহী কলেজ। আর এই স্বর্ণময়তার মূলে এখানে পাঠরত অতুল মেধাবী শিক্ষার্থীবৃন্দ। তাদের অনেকের নাম স্মরণে আছে, তবে সবার নাম অবচেতনে অঙ্কিত। যাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘তোমার নাম জানিনে, সুরজানি।’ আর সেই ‘সুরে সুরে কাছে দূরে’ যেখানেই থাকুক, তার সৌরভের মুগ্ধতায় এই রাজশাহী কলেজ আমার পরিচিতির অন্যতম বাহন। তাই রবীন্দ্রনাথের বাণী দিয়ে আবারও বলি :
‘তোমারি নাম বলব নানা ছলে
বলব একা বসে আপন মনের ছায়াতলে
বলব বিনা ভাষায়, বলব বিনা আশায়
বলব মুখের হাসি দিয়ে, বলব চোখের জলে
এরা সবাই আমার মানস সন্তান। সেই সাথে কিঞ্চিৎ নিজের কথা বলে নেই। আমার দুই ছেলে গোলাম সাকলায়েন রুমি এবং গোলাম কাওনাইন জামি এ কলেজ থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে। তখন আমি রাজশাহী কলেজে অবস্থানের অধিকার বঞ্চিত। এরা যথাক্রমে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অপরজন মেডিসিনে এফ.সি.পি.এস ও নিউরো মেডিসিনে বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বর্তমানে সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার লে. কর্নেল হিসেবে কর্মরত।
পরিশেষে একটা তথ্য না বললে আমার স্বপ্নময়তা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। রাজশাহী কলেজের বারো বছর বয়সের সময় ১৮৮৫ সালে বাংলা গানের ধারার পঞ্চকবির অন্যতম রজনীকান্ত সেন এফএ (বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করেন এ কলেজ থেকে। তখন কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন এ. সি. এডওয়ার্ড। কবি রজনীকান্ত ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে গেয়েছিলেন।
‘আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু
কম করে মোরে দাওনি;’
আমিও মাদ্রাসা পড়ুয়া ‘অকৃতি অধম’ হয়েও রাজশাহী কলেজে বিদ্যা বিতরণের সুযোগ অর্জন করেছিলাম। কান্ত কবির সবিনীত প্রাপ্তিযোগের ভাষা:
‘স্বপনে তাহারে কুড়ায়ে পেয়েছি
রেখেছি স্বপনে ঢাকিয়া’
ধার করে নিয়ে বলি, কাল প্রবাহের অযুত নিযুত বর্ষ পরিক্রমায় রাজশাহী কলেজে আমার পদচারণাকে সুখ-স্বপ্নের মতো ঢেকে রেখে জীবন সায়াহ্নে উপনীত হয়েছি। এটাই আমার জীবনে অশেষ প্রাপ্তি।
-গোলাম কবির (সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ)
