ভালোবাসার নিভৃত নির্যাস

নিভৃত পল্লীর উচ্চ বিদ্যালয় গণ্ডি পেরিয়ে ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয়বারের মতো রাজশাহীতে আসা। ভীষণ বদরাগী অথচ গণিত ও ইংরেজির অতুল শ্রেণি শিক্ষক প্রয়াত এমাজউদ্দীন স্যার বললেন, উচ্চমাধ্যমিকে রাজশাহীতে পড়তে হল জধলংযধযর ঙষফ এড়াঃ. কলেজে ভর্তি হও। মেধা ও যোগ্যতার নিদারুণ অভাবের পরিণতি, ভাগ্যে জুটলো ঙষফ নয় ঘবি এড়াঃ. ফবমৎবব ঈড়ষষবমব। জানি না, কী কারণে আমাদের এলাকায় এক সময় রাজশাহী কলেজ ঙষফ এড়াঃ. কলেজ নামে পরিচিতি ছিল। নিউ গভঃ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রাবাস থেকে রিকশায় বা হেঁটে সাহেববাজারে আসার মুহূর্তে রাজশাহী কলেজের সুদৃশ্য ভবন হৃদয়ে অকস্মাৎ দোলা দিত, আর ভাবতাম কলেজের ভেতরটা না জানি কত সুন্দর!

নিউ গভঃ ডিগ্রি কলেজ থেকে প্রাপ্তিটা যে ঢের বেশি সেটি অস্বীকার করলে অকৃতজ্ঞ হবো। কেননা, সেই প্রতিষ্ঠানের শ্রদ্ধেয় স্যারদের জন্যই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিভাগে ভর্তি ও ডিগ্রি লাভ। জীবনের লক্ষ্য কখনও আকাশচুম্বী ছিল না কিন্তু স্থির ও অদম্য লক্ষ্য ছিল শিক্ষকতা করা।

এমএসসি পাস করে আমার শিক্ষকতা শুরু হলো দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী কলেজে। কলেজটি ১৯৮৯ সালে সরকারিকরণ হলো। এ সুবাদে নিউ গভঃ ডিগ্রি কলেজে ১৯৯৪ সালে বদলি। ১৯৯৬-১৯৯৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজশাহী কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি বিলুপ্ত হলে নিউ গভঃ ডিগ্রি কলেজ হয়ে ওঠে উত্তরবঙ্গের তথা দেশে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার অন্যতম চারণভূমি। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ১০% কোটায় সরাসরি নিয়োগের আরেক সুযোগ ভাগ্যে জুটলে ১৯৯৯ সালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ পাবনা হয় আমার কর্মক্ষেত্রের অপেক্ষাকৃত বড় পরিসর। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সম্মানিত অনেক সহকর্মীর মতোই প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের ভালোবাসতাম নির্ভেজালভাবে। এরপর ২০০১ সালে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে রাজশাহী কলেজে যোগদান, জীবনের লালিত স্বপ্নপূরণ ও সুপ্ত ভালোবাসার স্ফুরণ যেন এক বর্ণালী রূপ ধারণ করল। পেলাম নতুন জীবন, যুক্ত হলো নতুন উন্মাদনা, নতুন শক্তি ও সুযোগ ঘটলো নিজেকে প্রকাশ করার ব্যাকুলতায়। 

লেখার শিরোনামটির জন্য যথোপযুক্ত শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে বার বার হোঁচট খাচ্ছিলাম। ভালোবাসা বলি আর প্রণয় বলি তাতো একটি শব্দ দিয়ে অন্তর্জগতের সৃষ্ট দোলার বহিঃপ্রকাশ আদৌও সম্ভব নয়। আর শিরোনামের শব্দটির একটি যুতসই বিস্তৃতিসহ যবনিকা পর্যন্ত লেখার ক্ষমতা থাকতে হবে সেটিও আমার নেই। রাজশাহী কলেজের শিক্ষক হওয়ার চেয়ে শিক্ষার্থী হওয়া অনেক অনেক গর্বের। ভাগ্য অপ্রসন্নের কারণে নয় মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে রাজশাহী কলেজে পড়ার সুযোগ ঘটেনি বিধায় গর্বের অংশীদার হওয়া ভাগ্যে জুটেনি। মহাকালের পরিবর্তনে প্রজ্ঞাবান শিক্ষকগণের বিদায়ের পর নিতান্তই শূন্যস্থানগুলো পূরণের সুযোগ সৃষ্টি আমার মতো শিক্ষকের ভাগ্য প্রসন্ন হয় বৈকি। এরূপ ভাগ্যগুণে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে রাজশাহী কলেজে যোগদান। রাজশাহী কলেজে যোগদানের শুরু থেকে প্রতিমুহূর্ত এক অজানা ভীতি তাড়িত করতো আমায়। ভীতিটা অন্যখানে, সেটি হলো— যৌক্তিক উপযুক্ততার ঘাটতির কারণে যে কলেজে অতি গর্বের অংশীদার শিক্ষার্থী হওয়া সম্ভব হয়নি সেই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হবার যোগ্যতা কি আমি ধারণ করি? ভয়কে জয় করার একটি অদম্য ও সাহসী শক্তি আমার বরাবরই ছিল কারণ আমি নিতান্তই অনুরক্ত হয়েই শিক্ষকতা পেশায় এসেছি। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলাম, আমার সবটুকু উজাড় করে দেব শিক্ষার্থীদের এবং আমি নিজেকে রাজশাহী কলেজের অপেক্ষাকৃত কম গর্বের অংশীদার শ্রেণি শিক্ষক হয়ে রাজশাহী কলেজ পরিবারের সঙ্গে স্মৃতি বিধুরতার সুতোয় আজীবন নিজকে বেঁধে ফেলব। তপস্যা থেকে শিক্ষকতা পেশায় নিজকে সম্পৃক্ত করা ও সাদামাঠা একজন কর্মী হিসেবে রাজশাহী কলেজের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রেও শ্রদ্ধেয় অগ্রজদের অনুকরণ ও অনুসরণ করার ভাবনাটিও মস্তিষ্কে কোনোদিন আসেওনি। আমার হৃদয় থেকে প্রতিনিয়তই নিসৃত ভাবনাগুলোকে ভেবেছি রাজশাহী কলেজের জন্য যেটি মানানসই হবে ঠিক তেমনটি করে। রাজশাহী কলেজে চাকরিকালে পাঁচজন শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষের সাথে কাজ করার আমার সুযোগ ঘটেছিল। তাঁরা হলেন প্রফেসর ড. কে.এম. জালালউদ্দিন আকবর, প্রফেসর আবদুল বাছির, প্রফেসর ড. মো. আশ্রাফুল ইস্লাম, প্রফেসর মো. শামস্ উল হক ও প্রফেসর ড. আলী রেজা মুহম্মদ আব্দুল মজিদ। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ড. কে.এম. জালালউদ্দিন আকবর স্যার অবসরে চলে যান। তিনি স্বল্পভাষী, সুদর্শন ও অতি বিনয়ী। প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ এবং চৌকশ কর্মকর্তা প্রফেসর আবদুল বাছির-এর অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান ভঙ্গুর প্রায় একাডেমিক কার্যক্রম নতুন প্রাণ পেল। কলেজ ক্যাম্পাসে বিদ্যমান ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির অবৈধ স্থাপনা যা ছিল শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের চরম অন্তরায় সেগুলো অপসারিত হয়। ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে শুরু করল। প্রফেসর আবদুল বাছির স্যারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি কথার চেয়ে কাজকে প্রাধান্য দিতেন। রসায়ন বিষয়ের অধ্যাপক হওয়ার সুবাদে তাঁর কাছে যাবার আমার সামান্যতম সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রফেসর ড. মো. আশ্রাফুল ইস্লাম, প্রফেসর মো. শামস্ উল হক প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অনেক চৌকশ এবং কলেজের প্রতি তাঁদের দরদ বা মায়া কোনটাই ঘাটতি দেখিনি। প্রফেসর মো. শামস্ উল হক স্যার কলেজের বেশ কিছু বেদখল জমি উদ্ধার করেছিলেন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে। রাজশাহী কলেজের ক্ষয়িষ্ণু ক্রীড়াঙ্গন নতুন উদ্যমে শুরু হয়। ক্রীড়া কমিটির বিশাল ভার অর্পিত হয় আমার উপর। প্রফেসর ড. আলী রেজা মুহম্মদ আব্দুল মজিদ নিরেট কোমল হৃদয়ের একজন মানুষ। সততাই ছিল তাঁর শক্তি। বলতে দ্বিধা নেই,  তাঁর বদান্যতায় উপাধ্যক্ষ হিসেবে আমার যোগদান ৯ জুলাই ২০০৯। অসামান্য পাণ্ডিত্যসম্পন্ন অধ্যক্ষ ও প্রথিতযশা শিক্ষকবৃন্দের হাতের ছোঁয়ায় রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এফএ, পরবর্তীতে ইন্টারমেডিয়েট ও আরোও পরে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পাশাপাশি অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সের জন্য শুধু সুখ্যাতি ছিল না, বলা চলে ছিল তুলনাহীন। আরোও যদি সুনির্দিষ্ট বা সুগভীরভাবে তুলনাহীন চিত্রটির বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে কোন রাখ—ঢাক না রেখে বলা যায় কলেজটির প্রধান প্রাণভ্রমরা ছিল উচ্চ মাধ্যমিক/ইন্টারমেডিয়েট শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। উপাধ্যক্ষ হিসেবে আমার যোগদানের পরপরই অধ্যক্ষ মহোদয়সহ কয়েকজন সহকর্মী মিলে ১৯৯৬ সালের পর থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়া উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি পুনঃপ্রবর্তন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। অধ্যক্ষ মহোদয়ের আগ্রহ ও উদ্দীপনা আমায় অনুপ্রাণিত করে। ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি পুনঃপ্রবর্তনে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শর্তের অন্যতম শর্ত ছিল, অনার্স ও মাস্টার্স শ্রেণির শিক্ষাদানকে ব্যাহত না করে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি অনুমোদন দেয়া। কলেজ কর্তৃপক্ষ যথারীতি ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে। বলাবাহুল্য, ১৯৯৬-১৯৯৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজশাহী কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ হলে নিউ গভঃ ডিগ্রি কলেজসহ রাজশাহীস্থ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এই অভাবটি সিংহভাগ পূরণ করে। সুদীর্ঘ বছরের এই ছেদ উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থীদের পদচারণায় বহুলাংশে অন্যান্য কলেজগুলোকে নিয়ে গিয়েছিল খ্যাতির শীর্ষে এবং পাশাপাশি এও সত্য রাজশাহী কলেজ ব্যতিরেকে রাজশাহীস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ রাজশাহী বিভাগে অভিভাবক মহলে একটি বদ্ধমূল ও দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হয় যে, রাজশাহী কলেজ উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি পুনরায় চালু করলেও এই কলেজের শিক্ষকগণ উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঠিক পাঠদানসহ তাদের প্রতি যত্নবান থেকে পারবে না। কারণ, সুপরিসরে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স পরিচালনায় কলেজটি ইতোমধ্যে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমনকি উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে রাজশাহী কলেজের শিক্ষকগণ সক্ষম ও পারদর্শী নয়, এই রিউমার সবিস্তারে সুকৌশলে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এর বিস্তর প্রভাব পড়ে ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর। রাজশাহীস্থ সকল কলেজে আসন সংখ্যা পূর্ণ হবার পর রাজশাহী কলেজে সত্যিকার অর্থে ভর্তি শুরু হয়। ফলস্বরূপ আসন সংখ্যা পূরণ হল না। অধ্যক্ষ মহোদয় আমাকে বাঁধাহীন স্বাধীনতা দিয়েছিলেন সকল ক্ষেত্রে। তাই তাঁর বিশ্বাসকে কখনও অমর্যাদাও করিনি। প্রকৃতপক্ষে অভিপ্রায় থেকে শিক্ষকতায় আসা ও যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অন্য সবার মতো আমিও নিখাদ আনন্দ পাই। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী যে সকল শিক্ষার্থী ভর্তি হলো তাদেরকে নিয়েই রাজশাহী কলেজ স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করলো। একটি পরিপূর্ণ ও পরিকল্পিত ছক অনুযায়ী শুরু হলো চ্যালেঞ্জিং যাত্রা। ভয় প্রতিনিয়তই কাজ করত সবার মনে বিশেষ করে আমার মধ্যে, যদি উচ্চমাধ্যমিক ফলাফলে প্রথমবার হোঁচট খায় তাহলে সত্যিকারের নিন্দুকেরা রাজশাহী কলেজ সম্পর্কে অপবাদ দিতে আরোও মরিয়া হয়ে উঠবে। একদিকে অনার্স ও মাস্টার্স শ্রেণির ক্লাস মনিটরিং এবং অপরদিকে উচ্চমাধ্যমিকের রসায়ন ক্লাস পরিচালনাসহ তাদের দেখভাল করা কতটা যে কঠিন ও পরিশ্রমের প্রয়োজন তা বর্ণনাতীত। প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে রাত ১০ টা, কোনোদিন হয়তো রাত ১২ টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের অগ্রগতি, উপস্থিতি, অনুপস্থিতি, অভিভাবকগণের সাথে প্রতিদিন কথা বলা এমন এক মহাযজ্ঞ সম্পন্ন করতে আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন অধ্যক্ষ মহোদয়। আর আমি এমন কিছু ত্যাগী সহকর্মী পেয়েছিলাম যে, তাঁরা সেই সময় সংসারত্যাগী নামে পরিচিত হয়েছিল। ২০১২ সালে উচ্চমাধ্যমিক ফলাফল প্রকাশ হলো। রাজশাহী বোর্ডে ৪র্থ স্থান দখল করল। মেডিকেল, বুয়েট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা করে নিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী। রাজশাহী বোর্ডে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে পরপর তিনবার ১ম ও সমগ্র বাংলাদেশে ৪র্থ এবং সরকারি কলেজসমূহের মধ্যে প্রথম হওয়ার গর্ব আরেক কালজয়ী ইতিহাস সৃষ্টি করল। পরবর্তী বছরগুলোতে ফলাফলের ভিত্তিতে বোর্ডসমূহ কলেজগুলোর অবস্থান ঘোষণা না করলেও ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালেও রাজশাহী কলেজ তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে এবং উচ্চশিক্ষায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাধিক্য ঈর্ষণীয়। ড. আলী রেজা মুহম্মদ আব্দুল মজিদ স্যার অবসরে যাওয়ার পর ১৪ আগস্ট ২০১৪ সালে উপাধ্যক্ষ পদ থেকে অধ্যক্ষ হিসেবে আমার যোগদান নবপ্রেরণা যোগায়। মনে উদয় হলো আজ থেকে এই সুবিশাল বাগানের শ্রেষ্ঠ মালি থেকে হবে আমাকে। অগ্রজ ও মহাযশা শ্রদ্ধাভাজন অধ্যক্ষগণের মতো জ্ঞান-গরিমা ও ব্যক্তিত্বকে অতিক্রম করার যোগ্যতা যে নেই এটি বলতে আমায় এতটুকু লজ্জাবোধ করে না। তাই ভাবলাম আমার যৎসামান্য প্রজ্ঞা-জ্ঞান ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে বাগানসমূহ পরিচর্যা মোটেও সম্ভব হবে না বরং পরিচর্যার জন্য ক্লান্তিহীন কায়িক শ্রম ও অফুরন্ত সময় দিতে হবে।

প্রতি মুহূর্তে নব নব স্বপ্ন আমাকে তাড়িত করতে শুরু করল। গভীর সংকল্প করলাম, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে রাজশাহী কলেজের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে সার্বিক পরিবেশকে অধিকতর শিক্ষাবান্ধব করা যায় কিনা? সরকারি বরাদ্দের জন্য অপেক্ষা করলে এটি করা মোটেও সম্ভব হবে না। আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণে ক্ষেত্র বিশেষে প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ বড় অন্তরায়। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো কিছু অসম্ভব নয়। পদ্মাসেতু নির্মাণে ঋণ সহযোগিতা যখন বিশ্বব্যাংক প্রত্যাহার করল, তখন আমেরিকায় অবস্থানকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি উক্তি করেছিলেন— ‘আমরা পারি, আমরাই পারব।’ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশিরা নিজেদের সামর্থ দিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ করবে। ভাবলাম, প্রতিষ্ঠানের নানান সীমাবদ্ধতা থাকবে এটিই স্বাভাবিক। আর সীমাবদ্ধতাকে জয় করে কাজ করার মধ্যে আনন্দ বোধকরি অনেক বেশি। শ্রেণিকক্ষ ও  শ্রেণিকক্ষের বাইরের পরিবেশ যেন শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে তেমন একটি ক্যাম্পাস তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হলো। বিষয়টি মাথায় এভাবে এসেছিল যে, মেধাবী শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস থেকে হবে নানান বিচিত্রতায় ভরপুর এবং অপরাপর ক্যাম্পাস থেকে স্বতন্ত্র। ব্যতিক্রমী ও স্বতন্ত্র ক্যাম্পাস একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল, সূক্ষ্ম-চিন্তাশীল ও মননশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এবং তার মধ্যে সামাজিক সচেতনতা এবং নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের সৃষ্টি হবে। আজ উচ্চমাধ্যমিক এবং অনার্স ও মাস্টার্স শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গর্বের প্রতিষ্ঠানটিকে প্রসিদ্ধির অনেক শীর্ষে নিয়ে গেছে, যা লেখাবাহুল্য। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ৪৩টির মত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্লাব/ সংগঠন সৃষ্টির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের বহুমুখী প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে। শিক্ষামন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত পর পর চারবার (২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯) দেশসেরা প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ঘোষিত র‌্যাংকিং-এ পর পর (২০১৫, ২০১৬, ২০১৭) তিনবার দেশসেরা শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের বিরল মর্যাদা লাভে অন্যতম নিয়ামক রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের অন্যন্যতা।

রাজশাহী কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তঃবন্ধন সৃষ্টির লক্ষে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের  শুধুমাত্র ২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ব্যাচগুলোর আগ্রহ ও উদ্দীপনা ছিল লক্ষণীয়। তারা এই উদ্দেশ্যে একত্রে ইফতার মাহফিলসহ ব্যাচভিত্তিক বিভিন্ন প্রোগ্রামে আবর্তিত ছিল। আবার ১৯৯৫-১৯৯৬ শিক্ষাবর্ষের পূর্ব ব্যাচগুলোও নিজেদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য আলাদা আলাদা ভাবে জাঁকজমক সহকারে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একত্রিত হয়েছে। যা বলছিলাম, সেটি হলো ২০১২-২০১৮ পর্যন্ত ব্যাচগুলো তাদের একটি পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করার জন্য আমাকে বারংবার অনুরোধ জানিয়ে আসছিল। তাদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করার জন্য প্রথম সভা ০৩/০৬/২০১৮ শিক্ষক মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। তাদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের একটি সম্ভাব্য সময়সূচি নির্ধারণের জন্য তারা ২০ অক্টোবর ২০১৮ তারিখ সন্ধ্যার পর অধ্যক্ষের বাসভবন অফিসে দলবলে উপস্থিত হয়। তাদের মধ্যে রাহুল সরকার পম (২০১২), রিফাত হোসেন অন্তর (২০১২), আসমাউল হুসনা (২০১৩), রাবিবা ইয়াসমীন (২০১৩), মুস্তাফিজুর রহমান সাকি (২০১৩), দিলরুবা তাসনিন তিথি (২০১২), সাবিহা (২০১৩), খালিদ বিন ওয়ালিদ আবির (২০১৪), মো. সুমন (২০১৪), সালমান ফারহান (২০১৪), মজিবুর রহমান (২০১৬), তৌহিদ ইসলাম (২০১৬), মৌমিতা রিভা (২০১৬), রাশিকুজ্জামান প্রিতম (২০১৭), শোহাগসহ (২০১৬) অনেকেই উপস্থিত ছিল। আলাপচারিতায় তাদের প্রশ্ন করলাম, তোমরা যে রিইউনিয়ন বা পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করতে চাচ্ছ সেটির নামকরণ কি হবে? সমস্বরে তাৎক্ষণিক তাদের উত্তরটি ছিল, কেন স্যার, সেটির নামকরণ হবে এইচএসসি অ্যালামনাই বা এইচএসসি পুনর্মিলনী। বললাম, তোমরা তোমাদের জায়গা থেকে সঠিক বলেছো; কিন্তু পূর্বের অর্থাৎ ১৯৯৫-১৯৯৬ শিক্ষাবর্ষসহ পূর্বের ব্যাচগুলোর শিক্ষার্থীদের ওফবহঃরঃু এইচএসসি আর না হয় ইন্টারমেডিয়েট হওয়ায় তারাও তো এই নামকরণের আওতায় চলে আসে। সে ক্ষেত্রে তোমরা কি করবে প্রশ্ন করা হলে তারা উত্তর দিল, ‘স্যার এইচএসসি পুনর্মিলনী লিখে প্রথম ব্রাকেটে ২০১২-২০১৮ লিখে দিলেই তো ঝামেলা শেষ।’ প্রকৃতপক্ষে সব ব্যাচগুলোকে নিয়ে একটি যে সুবিশাল পুনর্মিলনীর কথা আমি ভাবছি, তা তাদেরকে কোনো মুহূর্তেই বলি নি, কারণ তারা অত্যন্ত নবীন, তাই আয়োজনের এরূপ ব্যাপকতার কথা শুনে ভাববে আমি তাদের অনুষ্ঠান করতে দিব না অথবা সময়ক্ষেপণ করছি। ওরা আমাকে ভীষণভাবে ভালোবাসে তবে পাশাপাশি এও চরম সত্য যে, তাদের প্রতি আমার ভালোবাসার মাত্রাটি যে অনেক বেশি, তারা সেটিও অবগত। তাই কোনো রাখঢাক না রেখেই বললাম, তোমরা রাজশাহী কলেজের এইচএসসি/ ইন্টারমেডিয়েট সকল ব্যাচকে নিয়ে পুনর্মিলনী কর আমি সব ব্যবস্থা করব।

রাজশাহী কলেজের কর্মযজ্ঞ কলেজ প্রশাসনসহ সম্মানিত সহকর্মিগণকে প্রতিনিয়তই ব্যস্ততাই রাখে। এইচএসসি অ্যালামনাই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রে সুপরিসরে একটি সাধারণ সভার আহ্বান এবং সেটিকে কার্যকর করা আমার কাছে ছিল নিঃসন্দেহে আরেকটি জটিল সমীকরণ। সেই জটিল সমীকরণের কারণটির রহস্য অনুচ্চারিত রাখায় শ্রেয়।

বলা চলে অনেকটা অনিশ্চয়তা ও দোদুল্যমানতা নিয়েই ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বিকেল ৩ টায় এইচএসসি অ্যালামনাই পুনর্মিলনী সভা আহ্বান করা হয়। সভায় ৪০০জনের মতো প্রাক্তন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও মুহুর্মুহু ইতিবাচক বক্তব্য এইচএসসি অ্যালামনাই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান আয়োজনের তাগিদ ও এর সফলতার ক্ষেত্রে নবযাত্রার সূচনা হয় এবং পরমতৃপ্তি ও মঙ্গলামঙ্গল পরিণামের আশা নিয়ে শুরু হলো অ্যালামনাই পুনর্মিলনীর এক মহাযজ্ঞ। নানান উদ্ভাবনী শক্তির উপর ভর করে অপ্রতিরোধ্যভাবে চলমান রাজশাহী কলেজে এইচএসসি অ্যালামনাই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন দ্বিধাহীনভাবে বলতে হয় কলেজের কল্যাণের জন্য আরেকটি প্রশংসনীয় ও মর্যাদাকর উদ্ভাবনী। প্রকৃত অর্থে উপাধ্যক্ষ ও পরে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের পর সুশোভিত বাগানের পুষ্পতুল্য শিক্ষার্থীরা আমাকে পরম সুখ-প্রশান্তি দিতে শুরু করে এবং তীব্র উষ্ণতায় নিয়ে যায়। তারা আমাকে প্রতিদিন অতিরিক্ত শক্তি দেয় ও প্রতিমুহূর্তে প্রচুর নতুন নতুন ধারণা দিয়ে আমাকে অনুপ্রাণিত করতে থাকে। এমন এক বিস্ময়কর পরিবেশের সাথে গভীর প্রণয় সৃষ্টি হয়ে কখন যে আমাকে সংসার বিবাগী করে তুলেছে তা টেরও পাইনি। অনাগত কাল আমার এই নিভৃত প্রণয়ের কথা মনে রাখবে! এ সংশয় কার না হয়! রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুরের কুঠিবাড়ি থেকে চলে যাবার সময় বোটে বসে সকল দ্বিধা-সংশয়ের ঊর্ধ্বে উঠে গেয়েছিলেন:

ভালোবেসে, সখি, নিভৃতে যতনে

আমার নামটি লিখো তোমার

মনের মন্দিরে।

রাজশাহী কলেজকে ভালোবাসার নেশার নিভৃত নির্যাসটুকু আমি এক অকৃতিমানুষ হয়েও কালের পদপ্রান্তে রেখে যেতে চাই।

 

১২/১০/২০১৯

প্রফেসর মহাঃ হবিবুর রহমান
আইডি. নং-৯৫১৮
প্রাক্তন অধ্যক্ষ
রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

×