ইংরেজি ১৯৬২ সালের জুলাই মাস। ১৯৬২ সালেই আমি তদানিন্তন পূর্ব-পাকিস্তানের একমাত্র শিক্ষা বোর্ড ঢাকা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করি। এখন গ্রামে গ্রামে পাড়ায় পাড়ায় কলেজ স্থাপিত হয়েছে। সে সময়ের মহকুমা শহর যা আকারের জেলা শহরেও কলেজ খুঁজে পাওয়া যেত না গেলেও কোথাও বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না, কারণ শিক্ষক ও যন্ত্রপাতির অভাব।
আমি একজন পাড়াগ্রামের ছেলে। তাই গ্রামে উচ্চশিক্ষিত লোক ছিল না যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরামর্শ দিবেন। তাই কীভাবে কোথায় পড়ব ভাবছি-এ সময় আমার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ডেকে বললেন, তুই রাজশাহী যে সেখানে রাজশাহী কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে পারবি। অনেক পুরাতন আর বড় কলেজ। কিন্তু বিপদ বাধলো অন্য জায়গায়। রাজশাহী নাকি অনেক বড় শহর হারিয়ে যেতে পারি। তাই সঙ্গে বড় ফুফাকে পাঠালেন আমার আব্বা-আম্মা।
হ্যাঁ, ঠিকতাই। শহরে নেমে রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে রাজশাহী কলেজ খুঁজে বের করলাম। কলেজে ঢুকতে ভয় ভয় করছিল। অফিস বিল্ডিংই এত বড়। আমার চিন্তাশক্তি লোপ পেল। সংবিৎ ফিরে পেয়েই জিজ্ঞেস করলাম অফিসের অবস্থান। সবাই দোতলাতে দেখিয়ে দিলেন। ভয়ে ভয়ে দোতলায় উঠছিলাম আর ভাবছিলাম আমার মত গ্রামের ছেলেকে ভর্তি কি করবে? একজনকে জিজ্ঞেস করলাম ভর্তি কোথায় করা হয়। তিনি ক্যাশিয়ারকে দেখিয়ে দিলেন। গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন সাদা কাগজে দরখাস্ত দিয়ে যাও আর অমুখ তারিখে ইন্টারভিউ দিতে আসবে।
নির্দিষ্ট দিনে ইন্টারভিউ দিতে এসে দেখি হাজারখানেক ছাত্র-ছাত্রী বর্তমান রসায়ন বিল্ডিং ও প্রাণিবিজ্ঞান বিল্ডিং এর জায়গাটা ফাঁকা মাঠ ছিল সেখানে বসে আছে। তখন কলেজিয়েট হাইস্কুলের প্রাচীরও ছিল না। শুধু গ্রাম থেকে কেন আজকের বাংলাদেশের প্রায় সব জেলা থেকে এমনকি চট্টগ্রাম, সিলেট থেকেও এসেছে। কেমেস্ট্রি বিভাগে ইন্টারভিউ চলছিল। সে সময়ে বিজ্ঞান বিভাগে দুইটা সেকশনে (A ও B) ১০০ করে মোট ২০০ ছাত্র-ছাত্রী ১ম বর্ষ বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্র ভর্তি নিতেন।
আমার নাম ডাকতেই দৌড়ে গেলাম। সালাম দিলাম। স্যারেরা আমায় বসতে বললেন। বীজগণিতের দুইটা ফর্মুলা লিখতে বললেন। চটপট নির্ভুলভাবে শিখলাম। স্যার দেখে বললেন, যাও টাকা জমা দিয়ে ভর্তি হও। ভর্তি হলাম। আমি ‘বি’ সেকশনে পড়লাম। রোল নম্বর ছিল ১৫২।
ছয় মাস ক্লাস করার পর বাংলার ক্লাস করছি এমন সময় এক পিয়ন একটি চিরকুট নিয়ে ঢুকেছে ও স্যারকে দিতেই স্যার আমার রোল নম্বর ধরে ডাকলেন। দাঁড়াতেই বললেন, উপাধ্যক্ষ স্যার তোমাকে দেখা করতে বলেছেন। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সালাম দিয়ে ঢুকতেই স্যার জিজ্ঞেস করলেন বাড়ি কোথায়? আমি বললাম, স্যার আমার বাড়ি লালপুর। সাথে সাথে স্যার গালি দেওয়া শুরু করলেন। আমি বিনয়ের সাথে বললাম, স্যার আমি তো কলেজে কোনো অন্যায় করিনি। তবুও স্যার ছাড়লেন না, বললেন, গেঁও ভূত, আনাড়ি, মূর্খ ইত্যাদি। গালি শেষ করে বললেন, ‘যাও ক্যাশিয়ারের সাথে দেখা করো।’ ক্যাশিয়ারকে সালাম দিয়ে বললাম, উপাধ্যক্ষ স্যার পাঠালেন ক্যাশিয়ার সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ‘কি নাম?’ নাম বলতেই দুই খান লম্বা খাতা বের করে সই নিলেন। প্রথমেই বললেন তোমার বোর্ডের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ভিপিআই (বর্তমানে যাকে DG বলা হয়) স্কলারশিপ হোল্ডার তাদের বেতন ফ্রি, তাই ছয় মাসের সাত টাকা করে বিয়াল্লিশ টাকা দিলেন। গালি খাওয়ার পর একশত চৌদ্দ টাকা পেয়ে আনন্দে উল্লাসিত। সে সময়ের এত টাকা আনন্দ লাগারই কথা। প্রকাশ থাকে যে, সে সময়ে হোস্টেলে সিট রেন্ট ছিল মাসে সাত টাকা আর মিল চার্জ ছিল মাত্র বাইশ টাকা। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? আসলে যা লিখলাম সঠিক।
সেসময়ে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষের চেম্বারে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের নিচের ব্যাংকের কেউ প্রবেশ করতে পারতেন না। ছাত্রদের তো প্রশ্নই আসে না। সমস্যার জন্য বিভাগীয় প্রধানই যথেষ্ট। সে সময়ের অধ্যক্ষ ছিলেন সিলেট নিবাসী জনাব মরহুম আব্দুল হাই। একদিন শখ চাপলো যে কলেজে পড়ি সেই কলেজের অধ্যক্ষের চেহারা দেখবো না তা কি করে হয়? কেউ দায়িত্ব নিলেন না ভয়ে। শরণাপন্ন হলাম কলেজ ক্যাম্পাসে বৃদ্ধ জুতা সেলাই করা মথুর মিস্ত্রির। তাঁকে বললাম, কাকা, কলেজের প্রিন্সিপাল দেখতে কেমন? খুব মোটা, রাশাভারী, রাগী? মথুর কাকা হেসে বললেন, কাল সকাল ১০ টায় আসবে। তোমাকে দেখাব। ঠিক তাই, যথা সময়ে বসে আছি। কাকা ইশারা করে দেখাচ্ছে। ঐ দেখ আসছেন। দেখি একজন পিয়ন মাথায় ছাতা ধরে আছে আর প্রিন্সিপাল স্যার হেলে-দুলে আসছেন। কালো, লম্বা, পাতলা ছিপছিপে হেলে-দুলে হাঁটছেন।
সেসময় রাজশাহী কলেজে ছাত্র-রাজনীতি ছিল। তবে ছাত্রলীগ, ছাত্র-ইউনিয়ন, ইসলামী ছাত্র শিবির ইত্যাদি নামে দল ছিল— কিন্তু কার্যক্রম ছিল না। আর একটা দল ছিল স্থানীয় মাস্তান গোছের যারা প্রিন্সিপালের ডান হাত হিসেবে কাজ করতো। বিনিময়ে তারা দরিদ্র ফান্ড সহ বেসরকারি ফান্ডের টাকা হাতিয়ে নিতেন। পরবর্তীকালে তারাই আইয়ুব খান (পাকিস্তানের সে সময়ের প্রেসিডেন্ট এবং পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) গভর্নর মোনায়েম খানের গুণ্ডা বাহিনী হিসেবে সবাই চিনতো যার নাম ছিল N.S.F (National Students Federations).
আমরা যারা বহিরাগত ছাত্র-ছাত্রী তারা N.S.F এর ভয়ে নীরবে ক্লাস করা ছাড়া কথা বলতাম না। এমনকি খেলাধুলাও তাদেরই দখলে থাকত। ওদের ভয়ে আমরা কলেজ ক্যান্টিনেও ঢুকতাম না।
সেসময়ে (১৯৬২-১৯৬৪) রাজশাহী কলেজে নিয়ম শৃঙ্খলা নিয়ম তথা আইন কানুন খুবই কঠিন ছিল। যেমন শিক্ষকরা কেউ এক মিনিট পরে ঢুকতেন না বা ছাত্র-ছাত্রীরাও এক মিনিট পরে ঢুকতে পারতেন না। পাঠদান কালে পরিপূর্ণ নীরবতা পালন করতে হতো। তবে হ্যাঁ ক্লাসের ভেতরে স্যার যেমন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন করতেন তেমনি ছাত্র-ছাত্রীরাও স্যারদের প্রশ্ন করতেন পারতেন। ফলে বোর্ডের রেজাল্ট দেখা যেত বিশজনের পনের জনই রাজশাহী কলেজের। বিজ্ঞান বিভাগে কেউ ফেল করেছে বলে আমার জানা নাই।
আর একটি কথা না লিখলেই নয়। সে সময়ের ছাত্রীদের সঙ্গে ছাত্ররা সম্মানজনক দূরত্বে অবস্থান করতেন। সবাই সবাইকে সম্মান করে কথা বলতেন। ক্লাসের বাইরে মেয়েদের সাথে এমন ভাব দেখানো হতো যেন কেউ কাউকে চিনেন না।
যেহেতু আমি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম তাই প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের বিষয় উল্লেখ করা দরকার। রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসগুলো লেবরেটরি বিয়ারারাই অধিক দক্ষ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। রসায়ন ক্লাসে সল্ট এর গন্ধ নিয়ে বলে দিতে পারতেন কি সল্ট। আবার জীববিজ্ঞানের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে দেখতাম উনারা নিখুঁতভাবে সেকশনে কেটে স্লাইডে তুলতেন।
কলেজের পুকুরটি এখন পার্কে রূপান্তরিত হয়েছে। ছেলে-মেয়েরা জোড়ায় জোড়ায় অথবা দলবদ্ধভাবে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছে। আমাদের সময়ে পুকুরটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। গাছ-পালা, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণিতে ভরপুর ছিল। ব্যাঙ, কেঁচো ও বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ নমুনা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস ও পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করতেন।
অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা বা বোর্ডের পরীক্ষা সব পরীক্ষাতেই প্রতি বেঞ্চে একজন করে বসাতেন। পরীক্ষার হলে কথা বলা তো দুরের কথা ঘাড় ঘুরালেই বহিষ্কার। বহিষ্কার মানেই T.C হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো। শুধু কি তাই যেকোনো অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাতে ফেল করলে Force T.C দিয়ে কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হতো। ঐ সকল কড়াকড়ি আইনের মধ্য দিয়েই আমি ১৯৬৪ সালে নবগঠিত রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা (H.S.C) পাশ করি। বোর্ডের নিজস্ব বিল্ডিং না থাকায় কাজ শুরু হয়েছিল আজকের New Degree College বিল্ডিং এ। আমরাই ছিলাম ঐ বোর্ডের H.S.C এর প্রথম ব্যাচ।
-মো. আজহার আলী (১৯৬৪)
