স্মৃতির পাতা থেকে রাজশাহী কলেজ

১৯৫৪ সাল।

তখন আমার বয়স ১৬ বছর পেরিয়েছে মাত্র। ম্যাট্রিক পাশ করলাম থার্ড ডিভিশনে। কলেজ বলতে তখন রাজশাহী ছাড়া নিকটবর্তী আর কোনো কলেজ নেই। কিন্তু এই নম্বর নিয়ে কি ঐ নামি কলেজে ভর্তি হওয়া যাবে? ঐ কলেজের তৎকালীন অধ্যাপক শিব প্রসন্ন লাহিড়ীর সঙ্গে বাবার পরিচয় ছিল। তাঁর সহযোগিতায় আমি রাজশাহী কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ পেলাম।

হরিনগর গ্রাম থেকে গরুর গাড়িতে মেঠো সড়ক পথে বারোঘরিয়ায় মহানন্দার এপারে গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিল। নৌকায় মহানন্দার নদী পার হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেল স্টেশনে এলাম। এটাই আমার প্রথম রেল ভ্রমণ। রেলে আমনুরা, ওখানে অন্য ট্রেনে উঠে রাজশাহী এলাম।

বাড়ির গ্রাম্য পরিবেশ ছেড়ে কোনোদিন একা কাটাতে হবে ভাবিনি। বাবা যখন আমাকে হেমন্তকুমারী হোস্টেলে ভর্তি করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন তখন আমার কী কান্না! এখন ভাবলে হাসি পায়। ১৯৫৪ আর ২০১৯, ৬৫ বছরের ব্যবধান। এতদিন পূর্বের সব ঘটনা মনে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিছুতেই ভুলতে পারা যায় না। আর অতি প্রিয় বন্ধুপুত্র রানার তাগাদায় অতীতকে ধরে আমার চেষ্টা করছি। ক’দিন আগে রানা বর্তমান রাজশাহী কলেজের কিছু ছবি পাঠিয়েছিল হোয়াট্স অ্যাপে। আমার স্মৃতিতে যে ছবি আছে তার সাথে কিছুতেই মিলাতে পারছিলাম না। আমি তখনকার শিবগঞ্জ থানার হরিনগর গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বোর্ড থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হলাম আই-এ ক্লাসে। সঙ্গে ছিল আমার গ্রামের ভূপতি দাস। গ্রাম থেকে এত বড় শহরে এসে, বিশেষ করে কলেজের চাকচিক্য এবং অবয়ব আমাকে শুধু মুগ্ধ করেনি, বিহ্বল করে দিয়েছিল। বাংলার অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় কবি আশরাফ সিদ্দিকী এবং লজিকের অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় আব্দুল হাই আমাকে অভিভূত করেছিলেন তাঁদের পাঠদানের পারদর্শিতায়। অধ্যাপক সিদ্দিকী যে একজন খ্যাতনামা কবি ছিলেন তা জেনেছি পরে, দেশ পত্রিকায় মাঝে মাঝেই তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতো। অধ্যাপক হাই সাহেবের ক্লাস করার পর আর বইপড়ার প্রয়োজন হতো না। আমার বোন গীতা ১৯৬৫ সালে যখন ঐ কলেজে ভর্তি হলো তখন অধ্যাপক হাই রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ।

হেমন্ত কুমারী হোস্টেলে থাকতাম। কিন্তু ক্লাসে প্রিয় বন্ধু বলতে ৪/৫ জনের সঙ্গ ভুলতে পারি না। পাশের গ্রামের বজলুর রহমান লুটু, মাসিদুর রহমান আমার গ্রাম থেকে মাইল তিনেক দূরে মহারাজপুরের বাসিন্দা, ভূপতি দাস আর কুতুবুল আলম কুতুব। কুতুব ছিল মজার ছেলে, একাই জমিয়ে রাখতো আড্ডা। রাজশাহী কলেজের দিনগুলোর স্মৃতি এখনো মনকে পুলকিত করে রাখে। স্টেশন থেকে টমটমে করে হোস্টেলে আসা, হোস্টেলের বাজার করতে গিয়ে ১ হালি ইলিশ (৪টা), প্রত্যেকটার ওজন দেড় দুই সের— দেড় টাকায় কিনেছি। রান্নার ঠাকুরকে বলে দিতাম আমার জন্য এক বাটি ইলিশের তেল রাখবে। ঐ তেল দিয়ে ভাত মেখে প্রায় সব ভাত খেয়ে ফেলতাম।

লুটু ভালো ফুটবল প্লেয়ার ছিল। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন ক্লাসের সঙ্গে খেলা হতো। লুটুর পায়ে বল এলেই আমরা নিশ্চিত গোল হবেই। তার অতিদ্রুত গতি এবং পাস কেউ ঠেকাতে পারবে না। লুটুর কথা বলতে গিয়ে মন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। বছর ৬/৭ আগেও সে কোলকাতা বা অন্যত্র যাবার জন্য মালদা এসেছে কিন্তু আমাকে সে ভুলে যায়নি। খুঁজে খুঁজে আমার বাড়িতে এসেছে দুবার। কলেজের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছি। কিন্তু আমি যাবো বলেও যেতে পারিনি রাজশাহীতে। কয়েক বছর আগে আমাদের সবাইকে ছেড়ে বিলীন হয়ে গেছে পঞ্চভুতে। কিন্তু তার ছেলে রানা আমার খোঁজ রাখে নিয়মিত। ওকে বলেছিলাম রাজশাহীর খেজুর গুড়ের মতো সুস্বাদু পাঠালি আর পাই না। কিছুদিন পরেই রানা খেজুর গুড় নিয়ে হাজির, কিন্তু সেই স্বাদ আর নেই।

মাসিদুর, কুতুবুল আর ভূপতির সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু আমার জন্মস্থান হরিনগর গ্রামের ছেলে জাহাঙ্গীর সেলিম গম্ভীরা গানের উপর একটি বই লিখেছে— সেটা নিয়ে একদিন মালদার বাড়িতে উপস্থিত। বইটা খুলেই দেখলাম— একটা ছবিতে কুতুবুল আলমকে সংবর্ধনা জানাচ্ছেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। রাজশাহী কলেজে পড়াকালীন শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি বিশাল জনসভায় বক্তৃতা দিতে দেখেছিলাম। তাঁর বক্তব্য শুনে রোমাঞ্চিত এবং মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেই মানুষের সংবর্ধনা পাচ্ছে আমার প্রিয় বন্ধু কুতুব। সেলিমকে বললাম, তুমি ঢাকা ফিরেই কুতুবকে বলবে আমার কথা। আমার বসধরষ এ যেন যোগাযাগ করে এবং ফোনে কথা বলে। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। কারণ সেও এই পৃথিবীর মায়া ছাড়িয়ে ওপারে পাড়ি দিয়েছে। অতীতে যে আনন্দের দিনগুলো মনে পুলক জাগাতো আজ তা বিষাদ ডেকে আনছে।

রাজশাহী কলেজ একসময় কোলকাতার প্রেসিডেন্সীর থেকেও খ্যাত ছিল। এখন কেমন আছে জানি না। তবে বাংলার বহু হীরকখণ্ড সৃষ্টি করার এই খনি তার দৃষ্টি অব্যাহত রাখবে— এই কামনা করি। এই প্রথম রাজশাহী কলেজের প্রাক্তনদের একত্রিত করার জন্যে যাঁরা এই কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন তাঁদের সবাইকে জানাই আমার আদাব, নমস্কার, কৃতজ্ঞতা এবং অভিনন্দন।

 

– শুভেন্দু কুমার প্রামানিক (ব্যাচ ১৯৫৬)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

×