১৯৫৪ সালে ইংল্যান্ডের ওভাল ক্রিকেট মাঠে পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেটদল প্রথম টেস্ট ম্যাচে বিজয়ী হয়েছিল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সে সময়ে রাজশাহী তথা এদেশের ক্রিকেট খেলোয়ার এবং ক্রিকেট বোদ্ধাদের কাছে এটি ছিল একটি বিশাল ঘটনা। এই বিজয়ের এক বছর পর ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সেই বিজয়ী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক (স্কীপার) আব্দুল হাফিজ কারদার এসেছিলেন রাজশাহী শহরে। শহরে এসে তিনি রাজশাহী কলেজ মাঠ পরিদর্শন করেছিলেন। গঙ্গা তীরবর্তী সবুজ গালিচা সদৃশ্য মাঠ এবং মাঝখানের সুন্দর ক্রিকেট পিচ দেখে কারদার এতটাই মুগ্ধ হন যে, আনন্দের আতিশয্যে ব্যাট হাতে মাঠে নেমে পড়েন। রাজশাহী কলেজ মাঠে বেশ কিছুক্ষণ ব্যাট করে কারদার দর্শক এবং ভক্তদের আনন্দদান করেছিলেন। সেদিন আব্দুল হাফিজ কারদারের বিরুদ্ধে বল করেছিলেন মিডিয়াম পেসার আব্দুল আজিজ বাচ্চু। উইকেটের পেছনে ছিলেন রাজশাহীর কৃতী ক্রীড়াবিদ মতিন খান। আব্দুল আজিজ বাচ্চুর বোলিংয়ের প্রশংসা করেছিলেন কারদার। সেই সুবাদে আব্দুল আজিজ বাচ্ছু ডাক পেলেন করাচিতে পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে। কিন্তু ক্রিকেটের বিশালত্ব ও নান্দনিক প্রভাব তাকে আকৃষ্ট করতে পারল না। সংগীতের মহাসমুদ্রে অবগাহন করলেন। দেশবরেণ্য হলেন একজন সংগীতের ওস্তাদ হিসেবে। তাঁর ঘরানার শিল্পীরা আজ দেশবরেণ্য। বহু জনপ্রিয় গানের সুর সৃষ্টি করে তিনি আমাদের মাঝে অমর হয়ে রয়েছেন।
আমাদের আলোচ্য রাজশাহী কলেজ মাঠটি কিন্তু আদিতে ছিল একটি বিশাল দীঘি। দীঘিটির প্রাচীন নাম মহাকাল দীঘি বা কুণ্ড। অনুমান খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতকে বর্তমান রাজশাহী শহরের নাম ছিল মহাকালগড়। গৌড়ের সুলতানদের অধীনে এ অঞ্চলের একজন সামন্ত রাজা ছিলেন দৈত্যদানবের উপাসক। বর্তমান রাজশাহী মহানগরীর দরগাহপাড়া, রাজশাহী কলেজ এবং তৎসংলগ্ন এলাকা নিয়ে বসবাস করতেন উক্ত সামন্ত রাজা। এদের আরাধ্য দেবতার নাম ছিল মহাকালদেও। উক্ত মহাকালদেও এর প্রধান দুইজন সেবাইত ছিলেন সহোদর দুই ভাই। এদের একজন অংশুদেও চান্ডভন্ডি বর্মভোজ এবং অপরজন অংশুদেও খেজুরচান্দ খড়গ বর্মা গুজ্জভোজ। সেকালে দৈত্য ধর্মাবলম্বীদের তীর্থ ক্ষেত্র ছিল এই মহাকালগড় আজকের দরগাহপাড়া। ৪০ বিঘা জমির উপর ছিল মহাকালদেও এর দেবালয় দেওরাজার বাড়ি এবং এর সংলগ্ন পূর্ব পার্শ্বে মহাকাল দীঘি বা জাদুকুণ্ড। মহাকাল দেও ছিল এক ভীষণ দর্শন মূর্তি। উল্লিখিত সেবাইতদ্বয় মহাকালদেও এর তুষ্টির জন্য প্রতি বছর মহাআড়ম্বরে একাধিক নরবলি দিতেন। প্রয়োজনে মৌসুমের যেকোনো সময়েও নরবলি দেয়া হতো। মহাকালগড়ের রাজা এবং সেবাইতদের নরবলি প্রথার বিষয়ে স্থানীয় নাগরিকগণ ছিলেন ভীত-সন্ত্রস্থ। রাজা ও সেবাইতদের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ট এবং নিপীড়িত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পক্ষে হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ) যুদ্ধ করেন এবং রাজাকে পরাজিত করে এখানকার নরবলি প্রথাকে চিরতরে রদ করেন।
১৯২৯/৩০ খ্রিষ্টাব্দে যখন রাজশাহী/আমনুরা রেলপথ নির্মিত হচ্ছিল সে সময়ে আলোচ্য মহাকালদীঘিটি ভরাট করে খেলার মাঠে রূপান্তর ঘটানো হয়। রাজশাহীর বিশিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা (প্রয়াত) মাহফুজুর রহমান খানের সঙ্গে ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের একদিন কথা প্রসঙ্গে জানতে পেরেছি তাঁর মাতা রহিমা খাতুন ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে দরগায় জিয়ারত শেষে পূর্ব দিকের কলেজ মাঠ দেখিয়ে তাঁকে বলেছিলেন, ‘এই মাঠটি এক সময় বিশাল দীঘি ছিল। দীঘির উত্তর ও দক্ষিণপাড়ে বড় বড় কড়াই গাছ ছিল।’ তিনি বাল্যকালে এই দীঘি স্বচক্ষে দেখেছেন এবং ভরাট করাও প্রত্যক্ষ করেছেন। দরগাহর দক্ষিণ পার্শ্বের স্লুইস গেটটি পূর্বে একটি ছোট সাঁকো ছিল। সাঁকোর নীচ দিয়ে রেললাইন বসিয়ে ট্রলির সাহায্যে নদী থেকে বালু বোঝাই করে পুকুরে ফেলা হতো। মহাকাল দীঘি ভরাট হওয়া দেখেছেন এমন মানুষ এলাকায় এখন আর বেঁচে নেই। মহাকাল দীঘির পশ্চিম পার্শ্বের অংশটি এখনও রয়ে গেছে মুসুল্লীগণের ওজু ও গোসলের জন্য।
উল্লিখিত মহাকাল দীঘি ভরাট করে খেলার মাঠে পরিণত করার প্রকৃত সময়টি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে রাজশাহী কলেজের খ্যাতিমান অধ্যক্ষ রায় বাহাদুর কুমুদিনী কান্ত ব্যানার্জীর আমলে পদ্মা নদীর বালি এনে মহাকাল দীঘি ভরাট করে খেলার মাঠ তৈরি হয়েছিল। রায় বাহাদুর কুমুদিনী কান্ত ব্যানার্জী ১৮৯৭ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু মোট তিন মেয়াদে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সুদীর্ঘ কার্যকালের ঠিক কোন সালে মাঠটি তৈরি হয়েছিল সেটি নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। তবে ধারণা করা যায় যে, ১৯১০ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যেই মাঠটি তৈরি হয়েছিল।
১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী কলেজের দুইজন ছাত্র মিষ্টার চয়েন উদ্দীন আহমদ ও মিষ্টার এন, এন লাহিড়ী কলেজের জন্য বয়ে আনেন এক অনন্য সম্মান। সে বছরে প্রথম এই দুইজন ছাত্র এম, এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চয়েন উদ্দীন (পরবর্তীকালে খান বাহাদুর) ইংরেজিতে তৃতীয় বিভাগে এবং নরেন্দ্র নাথ লাহিড়ী (পরবর্তী সময়ে রায় বাহাদুর) রসায়নে দ্বিতীয় বিভাগে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী কলেজের খেলার মাঠটির নামকরণ করা হয় খান বাহাদুর চয়েন উদ্দীন প্লেগ্রাউন্ড।
১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে রাজশাহী শহরে কোনো স্টেডিয়াম ছিল না। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল আযম খান রাজশাহী সফরে আসেন। রাজশাহী কলেজের কয়েকজন ক্রীড়াবিদ (মতিন খান সহ) আযম খানের জীপের সামনে দাঁড়ালে আযম খান জীপ থেকে নেমে আসেন এবং ছাত্রদের কি প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করেন। ছাত্রদের একটিই দাবি ছিল খেলার জন্য একটি স্টেডিয়াম। আযম খানের নির্দেশে রাজশাহী জেলা স্টেডিয়ামটি ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়। এর পূর্বে ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে গঙ্গা (পদ্মা) তীরবর্তী পাঁচ আনি মাঠে রাজশাহীতে অবস্থানকারী ইউরোপীয় বণিকেরা বিশেষ করে ইংরেজগণ ফুটবল, হকি এবং ক্রিকেট খেলা প্রচলন করে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার মাঠ ছিল বর্তমানে যেখানে পর্যটন মোটেল রয়েছে সেই স্থানে। এছাড়াও রাজশাহীর প্রাচীন ক্রীড়া সংগঠন টাউন ক্লাবের মাঠ ছিল বর্তমান টেলিভিশন সেন্টারের স্থানটিতে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থা দীর্ঘকাল রাজশাহী কলেজের মাঠটি ব্যবহার করেছেন। ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলাগুলো এই মাঠেই হতো। রাজশাহীর বিশিষ্ট আইনজীবী রাজনীতিবিদ, ক্রীড়া সংগঠক এবং রেফারী বীরেন্দ্র নাথ সরকারকে ১৯৫৯-৬০ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত একাধিক ফুটবল খেলার রেফারির দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি। সে সময়কার বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়দের মধ্যে গোলাম আরিফ টিপু (বিশিষ্ট আইনজীবী), মোহাম্মদ মোহসীন ওরফে জামাল, মোফাজ্জল হোসেন বেনু, আবু বক্কার, ডা. আব্দুল গাফ্ফার, আব্দুল জব্বার (প্রখ্যাত ক্রিকেটার সাদ এর পিতা), মোজাম্মেল হক মজু, আব্দুল মুরশীদ তিতুমিয়া, তসলিম, মনীন্দ্রনাথ চৌধুরী ওরফে মনি, মঈনুদ্দীন আহমেদ বোনা, আব্দুল গাফফার (প্রাক্তন সেক্রেটারী এডুকেশন বোর্ড রাজশাহী), ডা. অমিয় গোবিন্দ দাস (জেলা পরিষদ রাজশাহী), ডা. আজমল হক টিপু (জেলা পরিষদ রাজশাহী), রেজাউল আহমেদ, নূরুল ইসলাম ওরফে নুরু, নূরুল ইসলাম মোল্লা এরা ছিলেন অন্যতম। বর্তমানে রাজশাহী মহানগরীর সত্তরোর্ধ বয়সী মানুষদের মধ্যে যারা উল্লিখিত ফুটবল খেলোয়ারদের রাজশাহী কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত খেলাগুলো দেখেছেন- এরা এখনও সেই উঁচুমানের ফুটবল শৈলীর চাক্ষুশ বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন। এঁদের পরবর্তীকালের ফুটবল খেলোয়াররা হলেন শামসু, জালালউদ্দীন জালু, আব্দুল হাকিম হাকু, জাফর ইমাম, ননী, হাতেম, মুনশাদ, আনফোর, খোকন, সেলিম প্রমুখ। এরা দীর্ঘদিন রাজশাহী স্টেডিয়ামের মাঠ কাঁপিয়েছেন।
ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজ মাঠের সবুজ চত্বরে বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের প্রথম পর্বে যে সকল ক্রীড়াবিদ তাদের ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শন করে ভক্তদের মাতিয়েছেন এদের মধ্যে প্রথমেই যাদের নাম আসবে এরা হলেন মতিন খান ও তাঁর অনুজ, শাকুর খান। এদের পাশপাশি ছিলেন জাফর ইমাম, তসলিম, ফয়েজ কলিন, আকুল, কায়েস, ফরহাদ জামান চৌধুরী, খোদাবক্স মৃধা, শাবাব আহমেদ, হান্নান খান। সে সময়কার ট্রাক অ্যান্ড ফিল্ডে মাঠ কাঁপানো ক্রীড়াবিদদের মধ্যে ছিলেন আনসার উদ্দীন আনফোর, আজিজুল আলম মন্টু, রায়হান প্রমুখ। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর কৃতী দৌড়বিদদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার সাইদুর রহমান ডন।
রাজশাহী শহরে ক্রিকেট জনপ্রিয়তা লাভ করে রাজশাহী কলেজে নিয়মিত ইন্টারক্লাস ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চালু থাকার কারণে। হেমন্ত কালের শুরু থেকেই কলেজের ঐতিহ্যবাহী কড়াই তলায় নেট প্রাকটিস শুরু হয়ে যেত। সে আমলে ক্রিকেট মৌসুম শুরু হতো প্রধানত শীতকালে। রাজশাহী কলেজে আমার প্রবেশ ঘটেছে ১৯৬৬ সালে। কলেজের ক্রিকেট মাঠ এবং মাঠের উত্তর দিক সংলগ্ন লন টেনিস কোর্টিিট (গ্রাস কোর্ট) আমার স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল। কলেজের ইন্টারক্লাস ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হবার পূর্বে একটি বড় ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। ইন্টারক্লাস ক্রিকেট টুর্নামেন্টের উদ্দেশ্য ছিল সে সময়ে সরকারিভাবে অনুষ্ঠিত দুইটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে কলেজের খেলোয়াড় বাছাই করা। একটি ছিল ইন্টার কলেজ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এবং অপরটি ছিল ইন্টার ইউনিভার্সিটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। উল্লেখ্য ওই দুইটি টুর্নামেন্টেই রাজশাহী কলেজ নিয়মিত অংশগ্রহণ করতো। ষাটের দশকে রাজশাহী কলেজ মোট দুইবার ইন্টার কলেজ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। অপরপক্ষে মোট চারবার ইন্টার ইউনিভার্সিটি ক্রিকেট চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেছিল রাজশাহী কলেজ। এ সময়ে রাজশাহী কলেজের ক্রিকেট ক্যাপ্টেন ছিলেন ফয়েজ।
উল্লিখিত ক্রিকেট টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি পর্বের শুরুতেই রীতিমতো একটি আনন্দঘন উৎসবের আয়োজন করা হতো। সেদিন কলেজ ছুটি থাকত। তবে শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীর প্রায় সকলেই থাকতেন মাঠে। মাঠ সাজানো হতো। দুইটি ক্রিকেট দল তৈরি হতো। একটি প্রিন্সিপ্যাল একাদশ এবং অপরটি চেয়ারম্যান এডুকেশন বোর্ড একাদশ। নিমন্ত্রণ করা হতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ রেজিস্ট্রার, কন্ট্রোলার অব এক্সামিনেশন এবং প্রখ্যাত শিক্ষকগণকে। এদিকে ডিভিশনাল কমিশনার সহ ডিআইজি, ডি, এম (বর্তমান সময়ের ডিসি) এবং তাঁদের সহকর্মী ম্যাজিস্ট্রেটগণকেও দাওয়াতপত্র দেয়া হতো। আরও আসতেন রাজশাহী সেনানিবাসের সামরিক অফিসারবৃন্দসহ শহরের বিশিষ্ট প্রবীণজনদের অনেকেই। রাজশাহী কলেজে অধ্যয়নকালে এ ধরনের মোট চারটি অনুষ্ঠান দেখা এবং অংশগ্রহণের সুযোগ আমার ঘটেছে। খেলা এক বেলাতেই হতো। আমাদের মধ্যে অনেকেই শুধু ফিল্ডিং করতাম। বোলিং এবং ব্যাটিং করতেন দুই দলের আমন্ত্রিত অতিথি খেলোয়ারগণ। এরপর লাঞ্চের পালা। বিশাল প্যান্ডেল তৈরি হতো। কোনো কোনো বছরে কলেজ ক্যান্টিনকে সাজিয়ে সেখানেই লাঞ্চের ব্যবস্থা হতো। খেলা চলাকালীন ফিজিক্স বিল্ডিংয়ের দোতালার বারান্দায় মাইক সংযোগ করে খেলার ধারা বিবরণী (জঁহহরহম ঈড়সসবহঃধৎু) দেয়া হতো। মোট তিন ভাষায় বাংলা, উর্দু এবং ইংরেজিতে রানিং কমেন্ট্রি হতো। হান্নান খান (সাংবাদিক এটিএন বাংলা) বাংলায় মাহবুব হাসান (অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল) ইংরেজিতে এবং তাহসিন উর্দুতে কমেন্ট্রি করতেন। আসলে রাজশাহী কলেজের ক্রিকেটকে উচ্চতায় পৌছে দিয়েছিলেন যে মানুষটি তিনি তৎকালীন রাজশাহী কলেজের সুযোগ্য অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল হাই। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত এই কলেজের দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্রিকেট মৌসুমে মাঠের বাইরে তাঁবুর মধ্যে বসে খেলা উপভোগ করতেন। অফিসের জরুরি ফাইলপত্র সেখানেই বসে দেখতেন অর্থাৎ অফিস এবং খেলা পাশাপাশি কোনটিকেই কম গুরুত্ব দেননি। খেলার প্রতি এমন নিবেদিত প্রাণ শিক্ষাবিদ এদেশে খুব কমই দেখা গেছে।
অনুষ্ঠানের পরের দিন থেকেই শুরু হতো ইন্টারক্লাস ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। আমাদের সময়ে (১৯৬৬-৭০) কলেজের ভালো ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সেরা ছিলেন নেহাল দুদু এবং সালেহ আহমেদ বাচ্চু। বোলিং ভালো করতেন শাবাব আহমেদ, হান্নান খান, নুরুদ্দীন হাবিব, জিল্লুল হাই রাজি এরা। মঈন উদ্দীন আহমেদ মানিক (এমএনএ) ছিলেন ভাল উইকেট রক্ষক। টিমে আমাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতো অলরাউন্ডার হিসেবে। সালেহ আহমেদ বাচ্চু ছিলেন একজন জেনুইন ওপেনার। ১৯৬৭ সালে বাচ্চুর একটি ইনিংস এর বর্ণনা দিয়ে আজকের লেখা করছি—
ক্রিকেটের পরিভাষায় বেশ কিছু পরিচিত শব্দ রয়েছে। ধারা বিবরণী শুনলে বা খেলা প্রত্যক্ষ করলে এসকল শ্রুতি মধুর শব্দগুলির সঙ্গে দর্শক শ্রোতাদের পরিচয় ঘটে। ‘স্টাইলিস ব্যাটসম্যান ক্রিকেটের পরিভাষায় ব্যবহৃত এই শব্দটি কৃতী ক্রিকেটার বাচ্চু এবং নেহাল উভয়ের ক্ষেত্রেই মানাতো একশত ভাগ। বিগত শতকের ষাটের দশকের সম্পূর্ণ সময়ে রাজশাহী কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত ক্রিকেট খেলা উপভোগ করেছেন এমন প্রবীণজনদের অনেকে এখনও জীবিত। সবুজ ঘাসে মোড়ানো নয়ন জুড়িয়ে যাওয়া কার্পেট সদৃশ্য এমন সুন্দর খেলার মাঠ এদেশে আর কয়টি ছিল জানা নেই। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা (পদ্মা)। মাঠের চারিদিকে কড়াই, পাম, কৃষ্ণচূড়া গাছ। এমনি মনোরম বাতাবরণের মধ্যে একটি শীতের সকাল। ব্যাট হাতে বাচ্চু ইনিংস ওপেন করতে চলেছেন। প্রথম বল। বাচ্চু দেখে বুঝে ব্যাট লিফ্ট করলেন। আউট সুইং বলটিকে সমীহ করে যেতে দিলেন কীপারের গ্লভ্সে। দ্বিতীয় বলটিকে ব্যাকফুটে এসে ডিফেন্স করতে হলো কড়া ভাবে। তৃতীয় বলটি ছিল সামান্য অফ স্ট্যাম্পের বাইরে। বাচ্চু মুহূর্তেই বলটিকে অনেকটা হাফ ভলির মতো বানিয়ে সামনের পা সামান্য এগিয়ে হাঁটু গেড়ে জোরে সট নিলেন। বল চলে গেল সীমানার বাইরে। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য। কয়েক শত দর্শক বিপুল করতালি দিয়ে দৃষ্টিনন্দন সেই চোস্ত কভার ড্রাইভটি উপভোগ করলেন। ষাটের দশকের সেই দিনগুলিতে বাচ্চু সহ নেহাল, দুদু এদের অনেক দুর্দান্ত ইনিংস আমরা উপভোগ করেছি, যেগুলি ছিল সত্যিকারের একেকটি ক্লাসিক কাব্য। এরই পরম্পরায় পরবর্তীকালে আমরা পেয়েছি পাইলট, সাদ, সানু, মঞ্জু, জেম, ডেভিড, মুশফিক বাবু ভোলা, ফরহাদ রেজা, ইবনে শহীদ সৈকত, লিটু, ইমরোজ, সিপার, নীলা সহ অনেক কৃতী ক্রিকেটারদের। এদের প্রায় সকলেই গড়ে উঠার পর্যায়ে রাজশাহী কলেজের মাঠ ব্যবহার করেছেন। এই মাঠটি জন্ম দিয়েছে এদেশের অসংখ্য নামি-দামি কৃতী ক্রীড়াবিদদের।
মাহবুব সিদ্দিকী
৬.১০.২০১৯
প্রাক্তন ছাত্র (১৯৬৬ থেকে ১৯৭২)
রাজশাহী কলেজ।
