‘আমরাই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে—
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’—’
সুন্দর হল সে
‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নামে খ্যাত রাজশাহী কলেজ আমার কাছে আবেগ ও বাস্তবতার এক মিশ্র অনুভূতি। এটির সাফল্যের খবরে আমি আনন্দে উদ্বেলিত হই, মন্দ খবর করে বিমর্ষ। এই কলেজ আমার কাছে অনুভবের, প্রেরণার, ভালোলাগার, ভালোবাসার নাম। রাজশাহী কলেজের সাথে আমি দু’ভাবে সম্পর্কিত। প্রথমত : শিক্ষার্থী হিসেবে দ্বিতীয়ত: শিক্ষক হিসেবে।
পরিচয় সূত্রে আমার রাজশাহী আগমন। আমার স্বামী অধ্যাপক আনিসুর রহমান তখন রাজশাহী কলেজের প্রভাষক। পদ্মার তীর ঘেষে শাহ মখদুম (রহ.) মাজার শরীফের পশ্চিমে একটি দোতলা বাসায় আমাদের নতুন সংসারের শুভ সূচনা। বাসার দোতলার দক্ষিণে দাঁড়ালে পদ্মানদীর বিপুলা জলরাশি একেবারে দৃষ্টি সীমার লাগালের মধ্যে চলে আসতো। অথৈ জলরাশির বুক ছুঁয়ে আসা ভেজা বাতাস চোখে মুখে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিত। তখন পদ্মা সারা বছর থাকতো অগাধ জলে টইটুম্বর। এপার থেকে ওপার দেখা যেত না। গানের ভাষায়— ‘কুল নাই কিনার নাই’।
প্রথম দিন দোতলার বারান্দায় দাঁড়িযে নদীর অপর পারের তটরেখা খুঁজতে গিয়ে দৃষ্টি পরাভব মেনে ফিরে এল। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল অবারতি নীল আকাশ পরম ক্ষমতায় আদরে অবনত হয়ে পদ্মর বিপুলা জলরাশিতে মিলিত হয়েছে। অনেকটা সমুদ্র দর্শনের মত লাগছিল। কতকগুলো মাছ ধরার নৌকা বিক্ষিপ্তভাবে বিচরণ করছিল। পালতোলা নৌকাগুলো দ্রুত চলে যাচ্ছিল কোন দূর অজানায়। অনেক দূর দিয়ে একটি স্টিমার নিঃশব্দে চলে যাচ্ছিল কোন গন্তব্যে কে জানে। তখন পদ্মায় স্টিমার চলত।
রাজশাহী আমার দিন দু’এক বার আমার স্বামীর সঙ্গী হয়ে নদীর পার দিয়ে খানিক হেঁটে এসে এক সময় রাজশাহী কলেজের বিখশাল প্রাঙ্গনে পা রাখলাম। সামনে তাকিয়ে কলেজের সুরম্য ইমারতগুলোর নির্মাণশৈলীর স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য সৌন্দর্য। আভিজাত্য অবলোকন করে আমি রোমাঞ্চিত ও অভিভূত হলাম মুগ্ধ হলাম। যা এখনও আমার মধ্যে রয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পূর্ণ যোগ্যতা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পারিপার্শ্বিক সব কিছু বিবেচনা করে রাজশাহী কলেজ ভর্তি হওয়ায় মনের নিভৃতে জমে থাকা গোপন ব্যথাটুকু মনে হল মিলিয়ে গেল।
শিক্ষার্থী আমি : ১৯৬৬—৬৯ শিক্ষাবর্ষে বি.এ সম্মান (বাংলা) শ্রেণিতে ভর্তি হই। কলেজ অধ্যক্ষ ছিলেন স্বনামখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আব্দুল হাই স্যার। প্রতিটি বিভাগ বরেণ্য শিক্ষকমণ্ডলী দ্বারা পরিচালিত হত।
বাংলা বিভাগ অনেক জ্ঞানী-গুণী খ্যাতনামা শিক্ষক মণ্ডলীর সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ বিভাগ ছিল। বিভাগের প্রধান ছিলেন বরেণ্য কথা সাহিত্যিক ও কবি শ্রদ্ধেয় আবদার রশিদ স্যার। অন্যান্য সম্মানিত শিক্ষকগণ অধ্যাপক রেজাউল হক, অসীত কুমার মজুমদার, সালেহ আহম্মদ, মাহবুব আলম বেগ। সাদেক আলী, আলতাফ হোসেন, শামসুল হক ও আমিনুর রহমান। পরবর্তীতে অধ্যাপক আবুল ফজল, খুরশিদ জাহান ও আখতার বানু আপাকে শিক্ষক হিসেবে পাই। শেষ বর্ষে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে পাই প্রথিতযশা অধ্যাপক শ্রী শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী স্যারকে। এমন জ্ঞানীগুণী পাণ্ডিত্যপূর্ণ শিক্ষকগণের স্নেহময় সান্নিধ্যই গড়ে তুলেছে আজকের এই আঙ্গিকে।
সম্মান শ্রেণিতে নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি সেমিনারও হত যথানিয়মে। আমাদের পঠিত কোন একটি বিষয়ের উপর নিবন্ধ রচনা করতে দেওয়া হত। নিবন্ধ রচনার দায়িত্ব থাকক শিক্ষার্থীদের উপর এবং আলোচনাও করত শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত দিনে শিক্ষার্থী-শিক্ষকগণের উপস্থিতিতে সেমিনার প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠত।
সম্মানের মূল বিষয়ের সাথে আমাদের দুটি সাব-সিডিয়ারি বিষয় একটি খরঃবৎধঃঁৎব বিষয়ে পড়তে হত। আমার সাব-সিডিয়ারী বিষয় ছিল দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। সে সময় আমরা ছাত্রী-কমনরুমে অবস্থান করতাম। ক্লাসের ঘন্টা পড়লে শিক্ষক মিলনায়তনের বারান্দায় দাঁড়াতাম (বর্তমানে ১ তলায় সেখানে কলেজ অফিস কক্ষ)। স্যারকে আসতে দেখে আমরা দলবেঁধে স্যারের পিছু পিছু ক্লাসে যেতাম, আবার ক্লাস শেষে স্যারকে অনুসরণ করে ছাত্রী কমনরুমে ফিরে আসতাম। মাঝে মাঝে অধ্যক্ষ মহোদয় আমাদের দর্শনের ক্লাস নিতেন। আমাদের পূর্বাহ্নেই জানিয় দেওয়া হত। আমরা যথারীতি স্যারকে অনুসরণ করতাম। যেহেতু অনির্ধারিত ক্লাস তাই নির্দিষ্ট কোন রুম ছিল না। সে ক্লাসরুম ফাঁকা পাওয়া যেত সেটিতেই স্যার ক্লাস নিতেন। একদিন স্যার ক্লাস নেবেন রওনা হলেন, ছেলেরাও এসে যোগ দিল। ১৭ নং গ্যালারীর কাছে এসে দেখা গেল সেখানে ক্লাস চলছে। আবার সামনে চলা। কয়েকজন ছাত্রকে পাঠালে হল ফাঁকা ক্লাসের সন্ধানে। তারা কলাভবন, উদ্ভিদবিদ্যা ভবন, ভূ-গোল বিভাগ ঘুরে এসে জানাল এগুলোতে ক্লাস হচ্ছে। শেষে ফিজিক্স বিল্ডিং এর গ্যালারী ফাঁকা পেয়ে সেখানেই আমাদের দর্শনের তরী ভিড়ল। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। তখন পদার্থবিদ্যার উত্তরে বহু পুরানো একটি একতলা দালানে রসায়ন বিভাগ ছিল। যা সম্ভবত: ‘গাউস হাসপাতাল’ নামেও পরিচিত ছিল। বর্তমানে সেটি ভেঙ্গে ফেলে বহুতল রসায়ন ভবন নির্মিত হয়েছে। দর্শনের আর একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন মল্লিক স্যার তাঁর ছিল প্রখর স্মৃতিশক্তি। তাঁর সকল ছাত্র-ছাত্রীকে পরম স্নেহে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করতেন। শিক্ষক হিসেবে রাজশাহী কলেজে যোগ দিই সে সময় যে তিনজন আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম তাদের অন্যতম ছিলেন মল্লিক স্যার। কলেজে যোগদান করে স্যারের সাথে সাক্ষাতের পর আমি পরিচয় দিতে যাচ্ছিলাম। আমাকে থামিয়ে দিয়ে পাশে দাঁড়ানো আমার স্বামীকে উদ্দেশ্যে স্যার বললেন—“দেখেন, আমার ছাত্রী আমাকে পরিচয় দিচ্ছে। আরে তোকে চিনব না।’ আমি স্যারের প্রখর স্মরণশক্তি দেখে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। এমন অনেক গুণী শিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিল। সবার কথা বলতে গেলে লেখার কলেবর অনেক বড় হয়ে ভেবে ক্ষান্ত হতে হচ্ছে। তবে একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের কথা না বললেই নয়। আমাদের অতিরিক্ত আরও একটি সাহিত্য বিষয়ে পড়তে হত। ইংরেজী ও সংস্কৃতের মধ্যে যে কোন একটি বিষয়ে নিতে পারতাম। ইংরেজী ভীতির কারণে আমাদের সিংহভাগ ছাত্র-ছাত্রী সংস্কৃত নিয়েছিলাম বিষয়টি পড়াতেন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক পরেশ চন্দ্র মন্ডল। আপাত গম্ভীর, মৃদুভাষী, স্নেহপরায়ন এই স্যারের পড়ানোর দক্ষতা ও কৌশলের জন্য আমারা ১ বছরের মধ্যে সংস্কৃত ভাষা পড়তে ও শিখতে লিখেছিলাম। পরীক্ষায় প্রায় সব ছাত্র-ছাত্রী লেটার মার্কস পেয়েছিল। আফসোস চর্চার অভাব আজ তা ভুলেই গেছি। পরবর্তীতে স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে চলে যান।
শিক্ষক আমি : ১৯৭৫ সালে পি.এস.সি দিয়ে উত্তীণ হই। আমার প্রথম নিয়োগ রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে। যে প্রতিষ্ঠানে আমি শিক্ষা গ্রহণ করেছি, সেই প্রয় রাজশাহী কলেজে নিয়োগ। কি যে আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কলেজ যোগদানের সময় অধ্যক্ষ ছিলেন স্বনামধন্য ব্যক্তি ড. মো. নইমুদ্দিন। আমি যখন ছাত্রী ছিলাম তিনি অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ছিলেন। সে সময় বাংলা বিভাগের প্রধঅন ছিলেন শ্রদ্ধেয় আব্দুল লতিফ চৌধুরী। ব্যক্তিত্ব-সম্পন্ন, ধীরস্থির ও পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। অন্য যাঁরা ছিলেন—অধ্যাপক হাবীবুন নবী, আমার শ্রদ্ধেয় স্যার সাদেক আলী, গোলাম কবির মোঃ নুরুল হুদা, আহাদ আলী মোল্লা, ফৌজিয়া চৌধুরী, শিখা রায়। পরবর্তীতে আসেন অধ্যাপক আশরাফুল ইসলাম, হারুন-অর-রশিদ, ফরিদা সুলতানা, হাসমত আরা বেগম, জিনাত মহল, মোঃ শামসুজ্জোহা, মঞ্জুআরা বেগম। প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের সম্পর্ক ছিল মধুর।
সেসময় সম্মান শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখনকার তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ছিল নিবিড়। বিভাগীয় সমস্ত কর্মসূচি যথাযথভাবে হতো। ক্লাসের বাইরেরও শিক্ষার্থীর পড়ালেখার বিষয়ে জানতে আসতে বিভাগে। আমরাও সানন্দে আদর সহযোগিতা করেছি। সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অনেক সময় বাড়ীতেও আসত লেখাপড়ার বিষয় নিয়ে।
উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির ক্লাস ছিল আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষার্থীরা ছিল অত্যন্ত মেধাবী, কেউ কেউ আবার দুরন্তও ছিল। দুরন্তদের আয়ত্বে এনে সবাইকে নিয়ে ক্লাস করার তৃপ্তিতে ছিল অনেক। কলেজের এসব শিক্ষার্থীরা পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। দেশে-বিদেশে নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছে। দক্ষতার সাথে কত ঘটনা, অঘটন মনে পড়ে যাচ্ছে—একটি দুর্ঘটনার কথা বড় বেশি মনকে বেদনায় আচ্ছন্ন করে। ঘটনাটি অধ্যক্ষ ও মো. নইমুদ্দিন স্যারের সময়। উচ্চ-মাধ্যমিকের একটি ছাত্র কলেজ সেটে বাস থেকে নামতে গিয়ে বাসের চাকার নিচেব পড়ে গুরুতরভাবে আহত হয়। তাকে তৎক্ষণাত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ছেলেটিকে বাচানোর জন্য অধ্যক্ষ স্যার থেকে শুরু করে শিক্ষক-ছাত্র মিলিত হয়ে রীতিমত যমে মানুষে যুদ্ধ। রক্তের প্রয়োজন হলে দেখা গেল প্রয়োজনের তুলনায় রক্তদাতার সংখ্যাই বেশি। শেষ পর্যন্ত সবার প্রানান্ত চেষ্টা বিফলে গেল। সবাই কাঁদিয়ে অকালে চলে গেল ছেলেটি। আহ…
সুখের ঘটার চেয়ে বেদনার ঘটনাই মানুষের সনে স্থায়ী হয় বেশি। আর একটি দুঃখের ঘটনা। ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে এ কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ড. মো. তমিজুল হক রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে আসেন। (প্রসঙ্গত উল্লেখ, এই কলেজের সম্মানিত অধ্যক্ষদের অনেকেই এ কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী ছিলেন)। সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় কর্তব্যরত থকাকালীন অধ্যক্ষের বাসভবনে হঠাৎ হৃদয়যন্ত্রের ক্রিয়াবন্ধ হয়ে ইন্তকাল করেন ১৯৮৪ সালের মে মাসে। এক বছরের কম সময় তিনি অধ্যক্ষ ছিল। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু আমার মনে গভীরভাবে দাগ কাটে।
আর একটি ঘটনা—তখন স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে সারা দেশ উত্তাল। রাজশাহী কলেজ ও এর বাইরে নয়। একটা অস্থির অবস্থা বিরাজ করছিল। মিটিং মিটিং, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া প্রতিদিনের ব্যাপার। অবস্থা এমন যে, কলেজ গেটে এসে দারোয়ানের কাছে জানতে চাওয়া হত পরিস্থিতি কেমন? একদিন কলা ভবনের নীচতলায় উচ্চ মাধ্যমিকের ক্লাস নিচ্ছিলাম। হঠাৎ হৈ চৈ, ছাত্রদের ছুটাছুটি। এক সময় পুলিশ ধাওয়া করে কলেজ এরিয়ায় প্রবেশ করে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে; তা কলাভবনের কাছে এসে পড়ে। চারিদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, ক্লাস রুমেও ধোঁয়া প্রবেশ করে। ছেলেরা দৌড়ে ছেলেদের কমনরুম দিকে বা নিরাপদ জায়গায় চলে গেল। মেয়েদের চোখ জ্বলতে শুরু করেছে, অনেকে ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। ওদের বাইরে না যেতে দিয়ে আমি তাদের সাথে করে দোলায় মনোবিজ্ঞান বিভাগে নিয়ে গেলাম। সেখানে মেয়েরা পানির ঝাপটা দিয়ে রুমাল ভিজিয়ে জ্বালা দূর করল। পরিস্থিতি শান্ত হলে মেয়েরা বাড়ি চলে যায়।
১৯৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে উদযাপিত হয় রাজশাহী কলেজের ‘শতবর্ষ উৎসব’। কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবার পর এটিই ছিল উল্লেখযোগ্য বৃহৎ পরিসরের অনুষ্ঠান। সুযোগ অধ্যক্ষ ড. মো. আবুল কাসেম স্যারের সুযোগ্যনেতৃত্বে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় মধ্যদিয়ে ২ দিনব্যাপী চলে এ আনন্দযজ্ঞ। আমি সে সময়ে এ কলেজেই কর্মরত। আমার স্বামী, দুই ছেলে এবং আমিসহ মোট চার অর্থাৎ পরিবারের সকলেই সেই আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের এই মিলন উৎসবে যোগ দিতে এসে হিসেব মেলাতে পারছি না। চারজনের মধ্যে দু’জন মহাজাগতিক সফরে চলে গেছেন।
রাজশাহী কলেজে চাকরিকালের শেষ দিকে আমাদের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর আফসার আলী স্যার। বিনয়ী, সাদালাপী মানবিক মূল্যবোধ সমৃদ্ধ একজন অসাধারণ মানুষ তিনি বটবৃক্ষের ন্যায় বিভাগের সকল শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের তাঁর ক্ষমতার ছায়াতলে একত্রিত করে একটি পরিবারে পরিণত করেছিলেন। রাজশাহী কলেজ ‘সাহিত্য মজলিশ’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন ছিল যা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, স্যারের সাংগঠনিক দক্ষতার গুণে তার পুনর্জাগরণ হয় যা চমৎকারভাবে সক্রিয় আজও বাংলা বিভাগের সুযোগ্য পরিচালনায়।
আমার প্রিয় এ কলেজটিকে এত স্মৃতি। এত ঘটনা সব লিখতে গেলে লেখার পরিধি ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। তাই অনিচছা সত্বেও ক্ষান্ত হতে হচ্ছে। পুরান শিক্ষার্থীরা বিদায় নিয়েছে, নতুনেরা এসে সে স্থান পূরণ করেছে। কত সম্মানিত সহকর্মী পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন, আবার নতুন সহকর্মী আগমন ঘটেছে। এত ও জগৎ সংসারের নিয়ম। বিশ্বকবির ভাষায় বলতে হয়—
কে আছে কোথায়, কে আসে কে যায়
নিমেষে প্রকাশে নিমেষে মিলায়,
বালুকার পরে কালের বেলায়
ছায়া—আলোকের খেলা।
– প্রফেসর (অব.) বেগম ফজিলাতুন নেসা (১৯৬৬)
