১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর শুরু হলো চিন্তাভাবনা কোথায় পরবর্তী লেখাপড়া হবে। আমার ইচ্ছা বিজ্ঞান পড়ার। কিন্তু সদ্য প্রতিষ্ঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয়নি। রাজশাহীতে পড়ানোর ব্যয় বহন করা বাবার পক্ষে কষ্টসাধ্য হবে—এই নিয়ে দ্বন্দ্বে ছিলাম। অবশেষে মেজ চাচার ঐকান্তিক আগ্রহ ও সহায়তায় বাবা রাজশাহী কলেজে পড়াতে রাজি হয়ে গেলেন। ভূষণ ভাই (বড় খালার বড় ছেলে) ও মেজ চাচা রাজশাহী কলেজে ভর্তির যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে নিয়ে গেলেন রাজশাহী। এর আগে অবশ্য আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রথমবার রাজশাহী যাই এবং দ্বিতীয়বার যাই ৮ম শ্রেণিতে পড়ার সসময় ১৪ই আগস্ট (পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস)। ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগস্ট ইংরেজের পরাধীনতার জিঞ্জির থেকে মুক্ত এবং ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাকিস্তান নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। এই স্বাধীন পাকিস্তান আবার দুইভাগে বিভক্ত হয়ে বাঙালি মুসলমানদের জন্য হলো পূর্বপাকিস্তান এবং উর্দুভাষীদের জন্য হলো পশ্চিম পাকিস্তান। আমার বয়স তখন তিন বছর। ১৪ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস হিসেবে প্রতি বছর মহা ধুমধামের সাথে উদযাপিত হতো। ১৪ই আগস্ট ট্রেনের কোনো টিকিট লাগবে না এমন কোনো সরকারি ঘোষণা ছিল না কিন্তু আমরা ছাত্ররা ধরে নিয়েছিলাম ১৪ই আগস্ট বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ করব। সেই সুবাদে পাকশির হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখে এসে রাজশাহীতে অবতরণ করেছিলাম দ্বিতীয়বারের মতো। এরপর আর কোনোদিন এই অঘোষিত সুবিধাটি গ্রহণ করার চেষ্টা করিনি।
সাক্ষাৎকার নিয়ে রাজশাহী কলেজে ভর্তি করা হয়েছিল তবে যারা প্রথম বিভাগে পাশ তাদের লেখাপড়া সংক্রান্ত তেমন কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। আমাদের সাথে সে বছর ৫০ জন ছাত্র/ছাত্রী সমগ্র দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রথম বিভাগে পাশ করে এসে রাজশাহী কলেজে আই,এস-সি (intermediate science) শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল।
১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ অবিভক্ত বাংলায় প্রথম শ্রেণির দ্বিতীয় কলেজ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিল। প্রথম ছিল কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ। বঙ্গভঙ্গের পরেও রাজশাহী কলেজ ছিল পূর্ববঙ্গ ও আসামের মধ্যে প্রথম শ্রেণির শ্রেষ্ঠ কলেজ। পাকিস্তান আমলে এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র শ্রেষ্ঠ আবাসিক কলেজ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তি যাঁরা এই কলেজের গর্বিত ছাত্র, অনেক গুণি ও পণ্ডিত ব্যক্তি যাঁরা এই কলেজের শিক্ষক এবং অনেক সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ যা দেশে বিদেশে কলেজের সুনাম ছড়িয়েছে তার ফিরিস্তি দিলে আমার কথা লেখা হবে না।
ভর্তি হওয়ার পর সমস্যা হলো কোথায় থাকবো। কলেজ হোস্টেল সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা না থাকায় হোস্টেলে সিটের জন্য আবেদন করা হয়নি। পরবর্তীতে সিট পাওয়া গেল না। ভূষণ ভাই আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন তাঁর বড় চাচার ছেলে আবদুর রশিদ ভাইয়ের বাসায়—সিপাইপাড়াতে। রশিদ ভাই তখন রাজশাহী হাই মাদ্রাসার শিক্ষক। আমার থাকার কোনো সুব্যবস্থা হয়নি শুনে দয়া পরবস হয়ে এবং অত্যন্ত আন্তরিকভাবে বললেন, গণি আপাতত আমার বাসাতেই থাক। রশিদ ভাইকে আমরা মেঘু ভাই বলে জানতাম। সেদিন যে মেঘু ভাই আমাকে চরম অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এ জন্য আমি তাঁর কাছে চির কৃতজ্ঞ। আমার মা আমার নানার সর্বকনিষ্ঠা সন্তান তার মা ছিল মেঘু ভাইদের ছোটবেলার খেলার সাথী। এজন্য মেঘু ভাই আমাকে হামেসা খালার বেটা বলে রসিকতা করতেন। মেঘু ভাইয়ের আমার প্রতি এই স্নেহপ্রবণ মনের কথা এবং আমাকে তাঁর বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার বদান্যতা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। তিনি প্রয়াত হয়েছে। দোয়া করি আল্লাহ তাঁকে বেহেস্তবাসী করেন। মেঘু ভাইয়ের স্ত্রী জোহরা ভাবী। সেইকালের রাজশাহী কলেজের আরবী সাহিত্যের অধ্যাপক সোলায়মান স্যারের জ্যেষ্ঠা কন্যা জোহরা ভাবী একজন মিষ্টভাষী মহিলা। কাছাকাছি বাসা হওয়ায় ভাবীর ভাইবোনেরা প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ এই বাসায় আসতো। ভাবীর ভাইবোনেরা ভাবীকে বুবু বলে ডাকতো। এই বুবু ডাকটা কেন জানি আমরাও ভালো লাগতো। তার আরো বেশি ঘনিষ্ট এবং আপন হওয়ার জন্য আমিও ভাবীকে বুবু ডাকা শুরু করলাম। তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বুবু বলেই ডেকে গেছি এবং তিনিও আমাকে ছোট ভাইয়ের মতোই ভালোবেসে গেছেন। জোহরা বুবুর কাছে ছয়মাসে যা পেয়েছি তা সারাজীবন মনে রাখার মতো। ছয় মাস পর মেঘু ভাই বাসা বদল করে অন্যত্র্য চলে গেলেন এবং আমার থাকার ব্যবস্থা হলো পার্শ্ববর্তী একটি মেসে (আইডিয়াল মেস)। মেসে থাকা অবধি মাঝে মাঝে মেঘু ভাইয়ের বাসা বেড়াতে যেতাম।
বিজ্ঞান বিভাগে দুটি সেকশন। আমি এ (A) সেকশনের ছাত্র রোল নং-১০৫। আমাদের সেকশনে ৬ জন ছাত্রীসহ মোট ১২৫ জন ছাত্র/ছাত্রী। বি (B) সেকশনে কোন ছাত্রী ছিল না। বি সেকশনের কিছু উৎসুক ছাত্র মাঝে মাঝে এ সেকশনে এসে ক্লাস করতো। এখন রাজশাহী কলেজে গিয়ে দেখা যায় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের গ্যালারির অর্ধেক ছাত্রীতে ভরা। এ থেকে অনুমান করা যায় নারী শিক্ষার উন্নতি কত দ্রুত ও ব্যাপক হয়েছে। এখনকার মতো সহপাঠীদের সাথে আলাপচারিতায় তুই তোকারীর প্রচলন ছিল না। আমরা দু-একজন ঘনিষ্ঠ ছাড়া বন্ধুদের সাথে লেন-দেন বলেই কথা বলতাম। মেয়েদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ তারা নিজেরাই তফাতে থাকার চেষ্টা করতো। ব্যবহারিক ক্লাসে দু-জন মিলে একটি ব্যাচ করা হতো। আমরা একে অপরকে পার্টনার বলতাম। বিজোড় সংখ্যক মেয়ে থাকলে একজন বা তিনজন মিলে ব্যাচ হতো। আমার পার্টনার ছিল সাম-স্যান্যাল নামে এক এল-এম-এফ পাশ করা ডাক্তার। এমবিবিএস এর কন্ডেন্সড কোর্স করার জন্য আই-এস-সি পাশ শর্ত ছিল। যদিও সান্যালের বয়স আমার চেয়ে অনেক বেশি তবুও তার সাথে বন্ধুর মতোই মিশতাম। রাজশাহী কলেজে পড়াকালীন সময়ে সেই ছিল আমার চিকিৎসক। অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে ঘনিষ্ট ছিল ডা. এমদাদ, ডা. কবির, ব্যাঙ্কার হাসেমউদ্দীন, ইসমাইল উকিল, অধ্যক্ষ আবুল হোসেন, অধ্যক্ষ ফজলুর রহমান। ডাক্তার এমদাদ কাকতালীয়ভাবে আমার বিয়াই হয়েছিল।
যে সকল স্যারদের ক্লাস করে ধন্য হয়েছিলাম তাঁরা হলেন বাংলা সাহিত্যে অধ্যাপক সুনীল স্যার, অধ্যাপক অসিত কুমার, অদ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল, অধ্যাপিকা সুফিয়া বেগম। ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপক ইলিয়া উদ্দীন, অধ্যাপক মজিবুর রহমান, অধ্যাপক আবু মোহম্মদ। পদার্থবিজ্ঞানে অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান, অধ্যাপক আব্দুল জব্বার, অধ্যাপক কবির হোসেন। রসায়নে অধ্যাপক ওয়াজেদ আলি, অধ্যাপক সায়েদুর রহমান। গণিতে অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, অধ্যাপক ফাররুক খলিল। যে সকল স্যারের কথা বললাম তাদের প্রত্যেকের ক্লাস করতে ভালো লাগতো—মুগ্ধ হয়ে তাদের বক্তৃতা শুনতাম। পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজেই মজিবুর রহমান স্যার, লুৎফর রহমান স্যার, কাসেম স্যার, গাউসুজ্জামান স্যার, সায়েদুর রহমান স্যারের সহকর্মী হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। লুৎফর রহমান স্যার এবং কাসেম স্যারের সাথে আমার পারিবারিক সম্পর্কও ছিল ঘনিষ্ট। এসব স্যারের চলন-বলন ও ক্রিয়াকলাপই ছিল আমার শিক্ষক হওয়ার পেছনে ১০০% প্রেরণা। রাজশাহী কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের সামনে একটি এবং জীববিজ্ঞান বিভাগের সামনে একটি টেনিস গ্রাউন্ড ছিল। জীববিজ্ঞান বিভাগের সামনের গ্রাউন্ডে ছাত্ররা খেলতো এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সামনের গ্রাউন্ডে স্যারেরা খেলতেন। বিকাল ৫টায় যখন পদার্থবিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাস শেষ করে গেট দিয়ে বের হতাম তখন দেখতাম স্যারেরা টেনিস খেলছেন এবং কিছু স্যার হেলানো বেঞ্চে বসে আছেন। এই দৃশ্য দেখে আমার মনে হতো—পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশি সুখের জীবন আর হতে পারে না। তার হৃদয়ের সংকল্প দৃঢ় হয়ে গেল শিক্ষক হতেই হবে। পূর্বেই বলেছি প্রতিটি স্যারের ক্লাস আমার ভালো লাগতো। জীববিজ্ঞান আমার ভালোলাগার বিষয় ছিল না তবুও বক্তৃতা ভালো লাগে বলেই সিরাজউদ্দীন স্যার, গাউসুজ্জামান স্যার ও সায়েদুর রহমান স্যারের ক্লাস করতাম। ফরম পূরণ করলেও জীববিজ্ঞানে পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু পরীক্ষার রুটিনে দেখা গেল জীববিজ্ঞান পরীক্ষাটা শেষ পরীক্ষা এবং এর আগে ৫ দিন ছুটি। ঐ দিনই স্যারদের বক্তৃতায় ক্লাস নোট পড়েই জীববিজ্ঞান পরীক্ষা দিয়েছিলাম। জীববিজ্ঞান আমার চতুর্থ বিষয় ছিল। পরীক্ষা ফলাফলে মাত্র ৫ যোগ হয়েছিল। এ জন্য আমার ভাগ্যে আই,এস-সি তে প্রথম বিভাগ জুটেনি। ভালো লাগতো পদার্থবিজ্ঞান। একদিন লুৎফর রাহমান স্যার গোলীয় তলে আলোর প্রতিফলন পড়াচ্ছেন। উত্তল দর্পণে (Convex mirror) প্রতিফলন পড়াবার সময় চিত্র আঁকতে আঁকতে বলছেন, One ray coming from the chemistry building parallal to the principal axis falls on the point L and after reflection it goes towards the sky. Another ray which is uicident on the pote of the mirror, after reflector it will go to-wards the ground. These two reflected rays will never meet forwardly. But it they are produced backwardly they appear to meet at a point behind the mirror. This point is called virtual image. মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে স্যারের লেকচার শুনলাম এবং ভাবলাম কে বলে পদার্থবিজ্ঞান একটি নিরস বিষয়। চেষ্টা করলেই এই বিষয়কে ছাত্র/ছাত্রীদের নিকট রসপূর্ণ ও আনন্দদায়ক করে তোলা যায়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় রসায়ন ও গণিতের চেয়ে পদার্থবিজ্ঞানে কম নম্বর ছিল অথচ পদার্থবিজ্ঞান পড়বার জন্য দৃঢ় সংকল্প হলাম।
কলেজ হোস্টেলের B ব্লকে বেশ কয়েকজন বন্ধু থাকতো। এজন্য B ব্লকে আমার যাওয়া-আসা ছিল নিয়মিত। তাই অনেকে ভাবতো আমি B ব্লকের ছাত্র। আমি যখন পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে রাজশাহী কলেজে যোগদান করার কিছুদিন পর A, B ও F শাখার সহকারী তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ পেলাম তখন ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে গেল আমি নাকি B ব্লকের ছাত্র ছিলাম। পরে ছাত্রদের আমার B ব্লকের ছাত্র হওয়ার শানে নূযল ব্যাখ্যা করলাম।
ক্লাস চলাকালীন সময়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্যাম্পাসে ঘুরাফেরা করতে পারতো না। ক্লাস না থাকলে হয় লাইব্রেরিতে না হয় কমনরুমে যেতে হতো। একদিন বিকালে জীববিজ্ঞান বিভাগের সামনের গ্রাউন্ডে ভলিবল খেলা হচ্ছে। আমরা কেউ দাঁড়িয়ে কেউ গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছি। হঠাৎ অধ্যক্ষ সামসুজ্জামান চৌধুরী এসে একজন লুঙ্গী পরা ছাত্রকে ডেকে নিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথায় পড়’। ছেলেটি বললো, ‘আমি এই কলেজেই আই-এ ক্লাসে পড়ি’। অধ্যক্ষ স্যার আবার জিজ্ঞেস কললেন, ‘কোথায় থাক’, ছেলেটি বললো, ‘আমি হোস্টেলে থাকি’। অধ্যক্ষ স্যার বললেন, ‘যাও প্যান্ট বা পাজামা পরে এস’। অধ্যক্ষ স্যার ক্লাস চলাকালীন সময়ে ক্যাম্পাসে রাউন্ড দিতেন। কোনো ছাত্র (ছাত্রীরা বাইরে থাকতো না) বাইরে থাকলে তখনই ছুটে যেত লাইব্রেরি বা কমনরুমের দিকে। এই ছিল তখনকার রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষের প্রতিবিম্ব।
কলেজের ফুলার হোস্টেলের সামনে ছিল এক বিরাট বটগাছ (বর্তমান যেটা আছে সেটা নয়)। এই বটগাছের তলায় বসত একজন মুচি-নাম মথুর। এই বটগাছও মথুর ছিল রাজশাহী কলেজের অনেক কালের অনেক কিছুটার সাক্ষী একটা নির্বাক অন্যজন স্ববাক। মথুর কাজ করত আর অনর্গল বকবক করে যেত। তার কথাবার্তা শুনে মনে হতো আমরা ক্লাসরুমে শিখছি আর সে গাছতলায় বসে বসে শিখছে। কোন অধ্যক্ষ কেমন পোশাক পরতেন। কীভাবে হাঁটতেন। কোন ছাত্রী কোন স্যারের সাথে প্রেম করতেন। কোন স্যার প্রতিদিন স্যুট বদলাতেন। কোন ছাত্রীর পেছনে ছেলেরা ঘুর ঘুর করতো। এই সব ছিল মথুরের বকবকের বিষয়। একদিন মথুরের সামনে আসি আর আমার এক বন্ধু সহপাঠী বসে আছি। বন্ধুটি তার জুতা কালি করাবে এবং আমি নতুন জুতা একটু মেরামতি করে কালি করাব। বন্ধু রসিকতা করে বললো—আরে এই জুতা কি আর মেরামতি করাবে—ফেলে দাও। এই শুনে মথুর বললো—কী বলেন স্যার। আপনারটা যতই কালি করান না কেন স্নো, পাওডার মাখা বৃদ্ধার মতোই লাগবে। আর এই স্যারেরটা একটু মেরামত করে কালি লাগিয়ে দিলে একেবারেই যুবতী। এই ছিল তার বকবকের ধরন। মথুর সকল ছাত্রকে স্যার, সম্বোধন করে কথা বলতো।
রাজশাহী কলেজে ছাত্র থাকা অবধি প্রায়শই বিকাল বেলায় পদ্মা নদীর ধার দিয়ে বেড়াতাম। তখন পদ্মা রাজশাহী শহরের পাশ দিয়ে অর্থাৎ বাঁধের ধার দিয়েই প্রবাহিত হতো। বর্ষার সময় পদ্মা হতো উন্মত্ত। নদীর ধার দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতাম মাঝিরা ইলিশ মাছ ধরছে। তখন পদ্মার প্রচুর ইলিশ মাছ ধরা পড়তো। পানি থেকে সদ্য ওঠা ইলিশ রূপার মতো ঝকঝক করতো। সেই ইলিশের রান্নার গন্ধ পাশের বাড়ি থেকেও পাওয়া যেত। ঝোলের রঙে ভাত হলুদ হয়ে যেত। এখন কেন সেই গন্ধ, সেই রঙ নেই? আমার মনে হয় সবকিছুই একই নিয়মে চলছে। এখনতো দেখতে পাই না সেই সহজ, সরল, হৃদয়বান মানুষগুলোর মতো মানুষ।
রাজশাহী কলেজে বড় ছুটি হলে অনেক দিন সন্ধ্যার ট্রেনে বাড়ি যেতাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জে অনেক দিন ট্রেন রাত ১১টা ১২টায় পৌঁছত। সেই রাত্রেই ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে গুণগুণ করে গান গাইতে গাইতে পায়ে হেঁটে রাত ১টায় বাড়িতে পৌঁছতাম। মানুষের ভয় ছিল না তবে মনের মধ্যে মাঝে মাঝে ভূতের ভয় দানা বাঁধতো। এখন দিনের বেলাতেও বাগানের ভেতর দিয়ে একাকী যাওয়াতে মানুষের ভয় রয়েছে। সবকিছু কেড়ে নিতে পারে। এমনকি জানটাও। মানুষমুখী এই সকল সন্ত্রাসীদের ভয়েই হয়তো ইলিশ তার স্বাদ, গন্ধ ও রঙ হারিয়েছে।
১৯৬১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শহর পর্যন্ত একটা সাদা রঙের বাস চলাচল করতে দেখতাম। কলেজ গেটে বাসটি দেখলেই কেন জানি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য মনটা আনচান করে উঠতো। তাই মেডিক্যাল কলেজ বা আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছাটা প্রবল ছিল না। এজন্যই তো আজ আমি যেমন রাজশাহী কলেজের গর্বিত ছাত্র তেমনি একজন গর্বিত শিক্ষকও বটে।
– প্রফেসর মো. আব্দুল গণি (১৯৬২)
