আমার কলেজ

এক সময় আমিও এই রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলাম। মনে হয়, এই তো সেদিন! কিন্তু আজ এখানে যারা পড়ুয়া, শুধু তারা কেন, যাঁরা তাদের পড়ান, তাঁদেরও তখন জন্ম হয়নি। অথচ ঐ সময় যাঁদের কাছে পড়েছি, অথবা যাঁদের পড়াতে দেখেছি তাঁদের কারো কারো কীর্তি ও নাম এখনও গভীর শ্রদ্ধায় এ দেশের মানুষ স্মরণ করে।

আমি ম্যাট্রিক পাশ করে এই কলেজে ভর্তি হই ১৯৫৫ সালে। বর্তমানে যা সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট একজামিনেশন (এসএসসি), ওই সময় তা ছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষা পেরোতে পারলে তবেই ঢোকা যেত কলেজে। শুরুতে একটি অন্তর্বর্তী বা ইন্টারমিডিয়েট স্তরে। তবে এই পর্বে পাঠ্যসূচি তিনটি শাখায় ভাগ হয়ে যেতো; কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য। এখন যাকে উচ্চ মাধ্যমিক বা হায়ার সেকেন্ডারি পর্ব বলি, তখন ইন্টারমিডিয়েট বলায় তাকেই বোঝাত। তবে এই পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের হাব-ভাব-চাল-চলনে তারা যে আর স্কুলপড়ুয়া নয়, এটা ফুটে উঠতে শুরু করতো। আগে থেকে চেনা-জানা না থাকলে তুই-তোকারি চলতো না। আজ অবশ্য শিক্ষাক্রম এই দুই বছরের পাঠকে স্কুলের গণ্ডিতে ঠেলে দিয়েছে, যদিও উচ্চ মাধ্যমিক বলে কিছুটা মান রেখেছে। আমরা কিন্তু তখন থেকেই কলেজিয়ানার ভাব দেখাতাম। কলেজ বিধিও তা মান্য করতো। ইন্টারমিডিয়েট-পরীক্ষা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্তিয়ারে। কলেজে পড়ি, বললে, পাড়াতেও একটু-আধটু তারিফ মিলত।

এর সঙ্গে রাজশাহী কলেজের ছাত্র হওয়া মানে আলাদা একটা গরিমা। অভিক্ত বাংলায় কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের পরেই ছিল এই কলেজের মর্যাদা। বলা যেতো না তা অযথার্থ। কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিলে তখন সেরা মেধার সমাবেশ ঘটতো প্রেসিডেন্সি কলেজে। তার পরেই রাজশাহী কলেজে। সরকারি কলেজ ছিল দুটোই। তেমন কলেজ আরো ছিল। কিন্তু শুধু এই দুটোতেই ছিল অনার্স পড়াবার চল। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে সরকারি কলেজ থাকলেও সে’সবে অনার্স পড়াবার ব্যবস্থা ছিল না। কারণটা সহজে অনুমেয়। ঐ সব কলেজ ছিল ঢাকা-বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায়। সেখানে অনার্স পাঠ তিন বছরের। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব সরকারি কলেজে অনার্স চালু করা প্রশাসনিক ও বিদ্যা শৃঙ্খলা ভিত্তিক, কোন দিক দিয়েই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। অন্যদিকে রাজশাহী কলেজ চলতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনে। তাতে অনার্স পাঠ ছিল দুবছর মেয়াদি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হবার পরেও ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এই বিধি বহাল ছিল। তাই প্রথম দিকে অনার্স পাঠের একমাত্র সুযোগ এ অঞ্চলে শুধু এই কলেজে মিলত। তাতে এর বিশেষত্ব আলাদা করে ধরা পড়তো। বলা যেতে পারে, শিক্ষা-সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানই ছিল এটি। ধ্যান-ধারণা বিকাশেরও। শুরু ১৮৭২-৭৩ সালে। তবে পূর্ণ বিকাশ বিশ শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকে। খ্যাতি এখনও অক্ষুণ্ন। যদিও ১৯৫৩-৫৪ তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকাণ্ড চালু হবার পর তার একাধিপত্য আর আগের মত নেই। তেমনটি আশাও করা যায় না। কলেজ কিন্তু স্বয়ং আরো বিস্তৃত ও গতিশীল হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্বে পড়াশোনাও চালু। কৃতিত্ব ঈর্ষণীয়। আমরা তৃপ্তি পাই।

এই কলেজ নিজ উদ্যোগে ২০০১ সালে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করেছিল : ঐতিহ্য রাজশাহী কলেজ। সত্যিকারে ভালো কাজ। তখন অধ্যক্ষ আখতার বানু তাঁর সহযোগীদের নিয়ে এখানে দায়িত্ব ও দক্ষতার এক বিরল উদাহরণ গড়ে তোলেন। বইটি আমাদের শুধু স্মৃতিকাতরই করে না, একভাবে শুদ্ধ আত্মপরিচয়ও ঘটায়— যদিও নিরাসক্ত ও নৈর্ব্যক্তিক তথ্য নির্ভর। আমার মত কলেজের পুরোনো ছাত্ররা অতীতের প্রেক্ষাপটে নিজেদের দেখার সুযোগ পাই। তারপরও সময় চলমান। সুধা-বিষে মেশা। উল্লাসে-আক্ষেপে জড়ানো। কলেজ এসবেরও সাক্ষী।

তার লাল রঙের মূল ভবন শহরের পুব-পশ্চিমে টানা বড় রাস্তা থেকে সরাসরি চোখে পড়ে। স্থাপত্য শৈলী অপূর্ব। সেটা দেশের গর্ব করার মত। এর মাথার ওপরে ছিল জ্ঞান ও চারুকলার গ্রীক দেবী এ্যথেনার অনিন্দ্যসুন্দর ভাস্কর্য। আজ যা মহারাণী হেমন্তকুমারী ছাত্রাবাস, শুরুতে তা ছিল সংস্কৃত কলেজের আলাদা ভবন। তার ওপরে শোভা পেত বিদ্যাদেবী সরস্বতীর মূর্তি। এসব প্রতিমা আর নেই। আমি দেখেছি। স্মৃতির পরম সঞ্চয়। তখন যা ছিল বিশেষ বিশেষ ছাত্রদের জন্য ফুলার হোস্টেল, এখন তা কোন কোন বিভাগের কার্যালয় ও পাঠভবন। আমাদের সময়েই আরো নতুন পাঠভবন তৈরি হয়। কাজের। তবে দৃষ্টিনন্দন নয়।

আমরা কলেজে আসি ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি নিয়ে। তাতে ছিল আমাদের আত্মস্বরূপের উদ্বোধন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি তখনও মেলেনি। পাকিস্তানে সরকারি কলেজে সে প্রশ্নই ওঠে না। তবু একুশে ফেব্রুয়ারি রাতেই দেশের প্রথম শহিদ মিনার গড়ে ওঠে এর প্রাঙ্গণে। তারই আপন ছেলে মেয়েদের বিদ্রোহী হাতে। পরদিন সরকারি হুকুমে পুলিশ বাহিনী হামলা করে তা গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু গড়ার স্মৃতিটাই অবিনাশী থাকে। রবীন্দ্রনাথের নটীর পূজা মনে পড়ে। আটান্নোয় সেপাইরাজ সরাসরি মাথায় চেপে বসে। তার তোষমোদে অনেকের লাগামছাড়া উৎসাহ চোখে পড়ে। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতি বছরই তার জানান দিয়ে যায়। যদিও কখনো কখনো নিরাভরণ, নিঃশব্দ চরণ। একবার, মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক-এর সভাপতিত্বে বসেছিল আলোচনা সভা। উপস্থিত যৎসামান্য। কিন্তু তখনও যে একুশে ফেব্রুয়ারির দীপশিখা নিভে যায়নি, এইটিই মনে রাখি। ওই আলোচনা সভায় এই কলেজেরও কেউ কেউ ছিলেন।

কলেজে আমার ইংরেজি পাঠ শুরু তখন প্রফেসর কবীর চৌধুরীর ক্লাসে। এটা আমি ভাগ্য বলে মানি। প্রথম অভিজ্ঞতা অন্য কারো সঙ্গেও হতে পারত। কিন্তু শুরুতেই প্রফেসর কবীর চৌধুরী যে তারে সাহিত্যের সুর বেঁধে দিলেন, তা আমার প্রত্যাশার বিস্তারকেও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি আমাদের পড়িয়েছিলেন কীট্স্-এর ঙহ ঋরৎংঃ খড়ড়শরহম রহঃড় ঈযধঢ়সধহ;ং ঐড়সবৎ— তার স্বাদ এখনও টাট্কা মনে হয়। তাঁকে পেয়েছিলাম মাত্র ক’মাস। সরকারি কলেজের অধ্যাপকেরা পরিযায়ী পাখির মত। কোথায় কখন বদলি হয়ে যান, ছেলেমেয়েরা জানতেও পারে না।

তখন আরো মনে দাগ কেটেছেন ইতিহাসের অধ্যাপক মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী, অধ্যাপক মীর জাহান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক দিলীপ বাগচী। আমার বিধিসম্মত পাঠ্যবিষয় ইতিহাস বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান, কোনটিই ছিল না। চুরি করে তাঁদের ক্লাসে গিয়ে পেছনের বেঞ্চে লুকিয়ে বসতাম। শেলী স্যার তখনই কিংবদন্তি। ভাষা আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। তাই সেরা ফল করেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি খোয়াতে হয়। প্রতিবাদে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই গলায় ট্রে ঝুলিয়ে সিগারেট বিক্রি শুরু করেন। চলমান এই দোকানের নাম ‘শেলী’জ ওন শপ।’ অনুমান, চুয়ান্নর প্রাদেশিক নির্বাচনের পর এখানে সরকারি কলেজে তাঁর ঢোকার সুযোগ মেলে। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে বিলেতে গিয়ে ইতিহাসে অনার্স ও ব্যারিস্টারি পাশ করে ফিরে এসে আইন চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। কর্ম জীবন শেষ করেন প্রধান বিচারপতি হয়ে। তবে তারপরেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়ে এক ক্রান্তিকালে তিনি রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করায় দৃষ্টান্তমূলক নেতৃত্ব দেন। গোটা দেশই ছিল তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। এছাড়াও বাংলার সর্বকালের সেরা মনীষীদের তিনি একজন। ছাত্র হিসেবে কাছে থেকে তাঁকে পেয়েছি, এ আমার সারা জীবনের মস্ত বড় প্রাপ্তি। প্রফেসর মীর জাহানও ছিলেন ইতিহাসের। অসাধারণ বাগ্মী। সে সময় ক্লাসে ইংরেজিতে বলাই ছিল চল। তিনি তাত ছেলেমেয়েদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন। প্রফেসর দিলীপ বাগচীর বসতবাড়ি ছিল রাজশাহীতেই পদ্মানদীর কোল ঘেঁষে। তিনি পাঠ্য বিষয়কে রসিকতার জালে এমনভাবে বাঁধতেন যে কোথা দিয়ে সময় কেটে যেত, কেউ খেয়ালই করতো না। পড়ার বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দিতেন ঠিক। বিকল্প সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিতেন। ওই একই রকম পারস্পরিক সম্পর্কের মজার মজার অপ্রত্যাশিত উদাহরণ টেনে এনে। আমরা কথার মারপ্যাঁচে মজতাম। কিন্তু কোথাও ভাঁড়ামি মনে হতো না।

প্রফেসর সুলতানুল ইসলাম ছিলেন অর্থনীতির দিকপাল পণ্ডিত। খ্যাতকীর্তি সাহিত্য-সাধক ডক্টর সুবোধ সেনগুপ্ত তাঁর স্মৃতিকথাতে হিনেদিবসাঃ-তে তরুণ সুলতানুল ইসলামকে যেমন দেখেছেন তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। এতটুকু বাড়িয়ে বলেননি তিনি। প্রফেসর ইসলাম ছিলেন অর্থনীতি চর্চায় আমাদের প্রেরণার উৎস। আর একজন সদ্য পাশ করা অল্প বয়সী মাত্র কিছু দিনের জন্য পেয়েছিলাম। এখান থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখে সিএসপি হয়ে চলে যান। তাঁকে পরে দেখেছি মুজিব নগর সরকারে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যেতে। এখন তিনি বাংলাদেশ সরকারে অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা। রাষ্ট্রের কল্যাণে একান্ত নিবেদিত। রাজশাহী কলেজে তাঁর মত একজনের ছাত্র হতে পেরেছিলাম,— মাত্র গুটিকয় ক্লাসের হলেও,— এ কথা মনে করে গর্ববোধ করি। তিনি আজকের অতি পরিচিত নাম, এইচ.টি. ইমাম।

আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট ফাস্ট ইয়ারে, তখন অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র,— এবং আমাদের বিশেষ শ্রদ্ধার প্রগতিশীল আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব— মমতাজউদ্দীন আহমদ। অসাধারণ বক্তা। সবাই বলতো দেশলাই-এর কাঠি। বিস্ফোরক কোনো বিষয়ের উপর টোকা দিলেই দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠবে। নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ, বাহান্নোর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর প্রাদেশিক নির্বাচনের পর ৯২-ক ধারা প্রয়োগে গণরায়ের অপমান, এসবের প্রেক্ষাপটে বলবার মত দাহ্য-বস্তু তিনি সহজেই পেয়ে যেতেন। শোনার সুযোগ পেলে আমরা টগবগ করে ফুটতাম। পরে তাঁর প্রতিভাকে তিনি বিপথে পরিচালিত করেন নি। অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন, মৌলিক নাট্যকর হিসেবে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, অভিনেতা হিসেবেও পাদপ্রদীপের আলো সবটুকু নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। আরো যা বলবার, কখনো তিনি বাংলা ও বাঙালির মর্যদা ক্ষুণ্ন করেন নি। আত্মসম্মানবোধ হারাননি। মাত্র ক সপ্তাহ আগে তাঁর জীবনাবসান হলো। আমার জীবনেরও একটা কুঠুরি ফাঁকা হয়ে গেল।

কলেজে পড়বার সময় ছাত্রদের ভেতর আর যাঁদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্ভাবনাময় মনে হতো, তাঁরা প্রায় সবাই পরে আমাকে হতাশ করেছেন। তাই বলে কেউ কেউ প্রতিষ্ঠা যে পান নি, সংবাদপত্রের শিরোনাম হন নি, তা নয়। একজন তো স্বৈরাচারী শাসনে প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। আরো নিচে নেমেছেন বিশেষ প্রতিভাবান বলে মনে হতো, এমন একজন। আমি বেদনা বোধ করেছি।

তবে আমার সময়ে এই কলেজের পড়ুয়াদের ভেতর সেরা প্রতিভা হাসান আজিজুল হক। অবশ্য তা দৈবে পাওয়া। ভালোই ছিলেন তিনি খুলনা দৌলতপুর কলেজে। ছাত্র আন্দোলনে ভিড়েছেন, এই অভিযোগে স্থানীয় প্রশাসন পেয়াদা পুলিশ নিয়ে তাঁর ওপর চড়াও হয়ে অমানসিক নির্যাতন চালায়। সেটাও তাদের যথেষ্ট মনে হয় না। কলেজ কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় তাঁকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দিতে। কপাল ঠুকে তাঁর রাজশাহী আসা। অনার্স নিয়েছিলেন তিনি দর্শনে। এই কলেজে দর্শনের অধ্যক্ষ তখন প্রফেসর আব্দুল হাই। ছাত্রদের হোস্টেলের সুপারিন্টেনডেন্ট। হাসান তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি সদয় হন। তাঁর বিভাগে হাসানকে তিনি শুধু ভর্তিই করে নেন না, হোস্টেলে নিরিবিলি একটা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। তখন থেকে হাসান রাজশাহী কলেজের। এখনও তিনি আমাদের সকলের অহংকার। খ্যাতি তাঁর বিশ্বজোড়া। আর একটু বলি। প্রফেসর হাই-এর ছেলে ডক্টর আত্ফুল হাই শিবলীও এই কলেজের এক উজ্জ্বল প্রাক্তনী। আশা করি এখানে তাঁকে চিনিয়ে দেবার প্রয়োজন নেই।

এই কলেজের আর এক প্রাক্তন ছাত্র অরুণ কুমার বসাক। এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমেরিটাস প্রফেসর। পদার্থ বিজ্ঞানে তাঁর মৌলিক গবেষণা বিশ্বের সর্বোচ্চ মানের। বিদ্যাচর্চায় ও গবেষণায় তিনি আদর্শস্থানীয়। প্রতিদিন সকাল নটায় তাঁর ল্যাবরেটরিতে ঢোকেন। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত নটা। বিদ্যাচর্চা যদি কারো লক্ষ্য হয়, তবে বিনা দ্বিধায় বলা যায়, তিনিই তাদের সামনে সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর জীবন যাপন প্রণালী এতটাই সাত্ত্বিক যে আমরা তাঁর নাগাল পাবার কথা কল্পনাও করতে পারি না। তবু সামনে সম্ভাবনার সীমাটাও চোখে পড়ে। তা-ও অনেক।

এতটা পড়ার ধৈর্য যদি কারো থেকে থাকে, তবে তিনি ভাবতে পারেন, প্রধানত ছেলেদের কথা ভেবেই বুঝি এই কলেজে বিদ্যাচর্চার আয়োজন। মেয়েরা থাকলেও তা পরিশিষ্টের মত। নীতিগতভাবে কথাটা ঠিক নয়। যখন থেকে আমাদের পাশ্চাত্য ধাঁচের শিক্ষার চল, তখন থেকেই মেয়েদের পড়ার সুযোগ সমান গুরুত্ব পায়। আমরা ভুলে যাই, কোন ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নারী গ্রাজুয়েট কেউ হবার আগেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুজন মহিলা বি.এ পাশ করেন। রাজশাহী কলেজ ১৯৪৭ পর্যন্ত ছিল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। পরেও বেশ কিছুকাল একই নিয়ম-নীতি চালু থেকেছে। শিক্ষা কাঠামোয় রদ-বদল যখন আসে, তখনও নারী শিক্ষার ব্যাপারে কোনো বাধার সৃষ্টি হয় নি। বাধা অবশ্য আছে সমাজের গভীরে। তবে তা ক্ষীয়মান।

আমি যখন কলেজে পড়ি, তখন মেয়েরা ক্লাস টিচারের পেছন পেছন পড়ার ঘরে এসে ঢুকতো। আবার পাঠ শেষ হলে ওই শিক্ষকের পেছন পেছন বেরিয়ে যেত। আপাতদৃষ্টে ছেলেমেয়েদের যোগাযোগের ক্ষেত্র ছিল খুবই সীমিত। সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, এসবে মেয়েরাও অংশ নিত। তবে থাকত তারা এক জোট হয়ে। পরীক্ষায় অসাধারণ ফল করেছে এমন মেয়েও দুষ্প্রাপ্য ছিল না। মহিলা অধ্যাপকও ছিলেন ক’জন। যোগ্য ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্না। তবে হঠাৎ হঠাৎ কানে আসত কোনো-কোনো ছেলেমেয়ের প্রেম ও বিয়ের খবর। কী করে ঘটত ভেবে কূল পেতাম না। নির্দিষ্ট ছকের ভেতরে সবার চলা-ফেরা। সেখানে এক-অন্যে মন দেয়া-নেয়ার সুযোগ মেলে কোথায়? মিলত যে, তা তো পরে বোঝাই যায়। কিন্তু কেমন করে, তার রহস্য ভেদ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

এই কলেজে ইদানিং পড়িয়ে গেছেন, দুজন অধ্যাপকের কথা বারবার মনে পড়ে। একজন নীতা আলি, অন্যজন সারোয়ার জাহান (বাবু)। ওরা যেন ভালো থাকে। আমার সময়ের সঙ্গে ওদের সময়ের যুগ-যুগান্তের ব্যবধান। তবুও ওদের কথা ভাবি। আর একজন সমাজ বিজ্ঞানের নাজনিন সুলতানা নাজ। ওর বাবা জনাব আব্দুর রহমান ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও পরে বিশ্ববিদ্যালয়-কোষাধ্যক্ষ। নাজও যেন সুখে থাকে, নিশ্চিন্তে থাকে। সেই সঙ্গে আমার এই কলেজ ‘স্বর্গে সুখিনো ভবন্তু।’ সেরার তকমা পেয়েছে। তা বজায় থাক।

 

– সনৎকুমার সাহা (১৯৫৭)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

×