বাংলাদেশে বাণিজ্য শিক্ষা : রাজশাহী কলেজের ভূমিকা

বৃটিশ একদিন এ দেশে ব্যবসা করতে এসেছিল। পরবর্তীকালে চতুর বৃটিশ রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সমর্থ হয়েছিল। এ ইতিহাস অল্প-বিস্তর সবারই জানা। রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে পেয়ে তারা আমাদের দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুকৌশলে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে। তারা তাদের নিজস্ব পণ্য আমাদের বাজারে প্রচলনের বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। এক সময় দেখা গেল আমাদের দেশীয় শিল্প বিলুপ্ত প্রায়। বৈদেশিক বাণিজ্য আমাদের দেশীয় বণিক সওদাগরদের স্থলে বৃটিশ বণিকেরা আসর জমিয়ে বসে। এর কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাদের মদদ যুগিয়েছিল। বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত দেশকে তারা পরবর্তীকালে পশ্চাদভূমিতে (Hinterland) পরিণত করে।

মধ্যযুগে বাংলা তথা ভারতবর্ষ প্রাচুর্যের দেশ ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ও আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে একটি স্বর্ণালী সময় অতিক্রম করেছে। বাংলার মানুষ ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’ প্রবাদটি ভালো করেই উপলব্ধি করেছিল। আর তাই মধ্যযুগে বাংলার বণিকরা হাতে বাওয়া নৌকায় ক’রে বিপদসঙ্কুল বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে চলে যেত সিংহল, ব্রহ্মদেশ, ইন্দোচীন, ইন্দোনেশিয়া, ম্যানিলা, চীন ও আফ্রিকার উপকূলে। এইসব বণিক বা সওদাগরদের বাণিজ্য যাত্রার বর্ণনা ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন লোকগাথা ও লোককাব্যে। যেমন চাঁদ সওদাগর, ধনপতি ও তার পুত্র শ্রীমস্ত সওদাগরদের কাহিনি বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত। ইউরোপীয় পর্যটক ডুয়ার্তে বারবোসা (১৫১৪ খ্রি.) বাংলায় আসেন। তাঁর বর্ণনানুযায়ী আভ্যন্তরীণ শহরগুলোতে হিন্দু ব্যবসায়ী ও সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে মুসলমান বণিকদের প্রাধান্য ছিল।  এর পেছনে কারণ হচ্ছে হিন্দুরা সমুদ্র যাত্রা ধর্মের দিক থেকে গর্হিত মনে করতো।

মধ্যযুগের প্রাচুর্যে ভরা বাংলাদেশই ছিল প্রকৃত সোনার বাংলা। এই দেশ সম্বন্ধে পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ কাহিনিতে খোরাসানবাসীর একটি উক্তি উদ্ধৃতি দিয়েছেন— ‘দোযখ-ই-পুর নিয়ামত’। গিব সাহেব এর ইংরেজি অনুবাদ করেছেন— ‘হেল্ ফুল অব গুড থিংকস।’ বাংলা অনুবাদ করলে বলা যায় বাংলাদেশ ‘প্রাচুর্যের দোযখ’।  আমাদের প্রাচুর্য দেখে বিদেশী বণিকরাও বাংলায় আসতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে। আমাদের বাংলায় পণ্য-দ্রব্যের প্রাচুর্য যেমন ছিল তেমনই ছিল সস্তা। পনেরো শতাব্দির শেষে ইতালির পর্যটক ভারথেমা খাদ্য দ্রব্যের স্বল্প মূল্য দেখে বলেছিলেন, ”I never saw a country in which provisions were so cheap’.  পর্তুগিজ পর্যটক ডুয়ার্তে বারবোসা (Duarte Barbosa) বাংলায় এসেছিলেন ষোড়শ শতকে। বারবোসা যেসব দেশের সাথে পূর্ব বাংলার বহির্বাণিজ্যের কথা বলেছেন সেগুলো হল করমণ্ডল, মালাবার, কাম্বে, পেগু, তর্ণাসারী, সুমাত্রা, সিংহল এবং মালাক্কা। বাংলার বিভিন্ন শহরে আরব, পারস্য, আবিসিনিয়া ও ভারতের অন্যান্য প্রদেশের বণিকরা স্থায়ীভাবে বাস করতো।  অর্থাৎ মধ্যযুগে বাংলার বণিকরা যেমন আমাদের পণ্য নিয়ে যেত দেশের বাইরে বিদেশী বণিকরাও তেমনি আসতো ঐশ্বর্যশালী বাংলায়।

বাংলার পণ্য শুধু যে বিদেশে যেত তা নয় ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে রপ্তানি হত আমাদের পণ্য। কৃষিজাত পণ্যদ্রব্যের মধ্যে গুড়, সুপারী, তামাক, তেল, আদা, পাট, মরিচ, ফল, তাড়ি ইত্যাদি ভারতের অন্যান্য প্রদেশে এবং বিদেশে রপ্তানি করা হতো। ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দের পূর্বে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বৎসর ৫০,০০০ মন চিনি রপ্তানি হতো। বাংলার বর্তমান সুপরিচিত রপ্তানি পণ্য পাট ও চা সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমে বিদেশে পরিচিত হয়।  উপরিউক্ত কৃষিজাত পণ্য ছাড়াও কাঁচা রেশম, লবণ, গালা, আফিম, নানা প্রকার মসলা, সোহাগা, সোরা, নীল, তেল ও মাদুর ঔষধ এবং ক্রীতদাস জল ও স্থল পথে ভারতের নানা স্থানে তথা সমুদ্র পথে এশিয়ার নানা দেশ বিশেষত লঙ্কা দ্বীপ ও ব্রহ্মদেশে রপ্তানি হতো। এছাড়া বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্প জগৎ বিখ্যাত ছিল। বাংলার মসলিন রপ্তানিও হত পারস্য, তুরস্ক এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বিদেশি বিভিন্ন পর্যটকদের লেখায়ও বাংলার আমদানি রপ্তানির বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। বাংলার আমদানি দ্রব্যগুলো ছিল প্রধানত— রূপা, পেরেক, নাট, টিন, ভেলভেট, জাপানি তামা, হাতি, ঘোড়া, শঙ্খ, টঙ্ক, পলা, নীল প্রভৃতি দ্রব্য।  এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন যে, বৃটিশ আগমনের পূর্বে অর্থাৎ সিরাজের আমলে আমদানির চেয়ে রপ্তানির অংশ ছিল অনেক বেশি। ডাউ সাহেব বলেছেন, ”The Balance of trade was against all nations in favour of Bengal.’  অথচ আজকের দিনে অনুকূল বাণিজ্যিক ভারসাম্য বাংলাদেশের কাছে একটি অকল্পনীয় অভাবনীয় দুর্লভ বস্তু মাত্র।

বৃটিশ আমাদের শিল্প ব্যবসায় বাণিজ্য বিনষ্ট করেছে পাশাপাশি তারা এ দেশে বাণিজ্য শিক্ষার এবং বাংলা ভাষা শিক্ষার কোন প্রকার পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। রাজশাহী কলেজে যখন সংস্কৃত, আরবী, ফারসীসহ বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের বেশ কিছু বিষয়ে সম্মান কোর্স চালু রয়েছে তখন বাংলা ভাষায় অনার্স কোর্স চালু ছিল না। রাজশাহী কলেজটি কী বাংলাদেশের বাইরে? এ কারণেই শিক্ষক তালিকায় বাংলা বিভাগে একজন শিক্ষকের নাম পাওয়া যায়।  বৃটিশ বাংলায় বাংলার পঠন-পাঠন ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং অবহেলিত। তখনকার দিনে ইন্টারমিডিয়েটে ২০০ ইংরেজি আর ১০০ বাংলা পড়া হতো। ডিগ্রিতেও অনুরূপ। অতএব বাংলা বিভাগে একজন শিক্ষকের নাম পাওয়া যায়। আর বাণিজ্য শিক্ষার তো কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ছাড়া অন্য কোন সরকারি কলেজে বাণিজ্য শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। কোনো সরকারি কলেজে প্রেসিডেন্সি ছাড়া বাংলায় অনার্স কোর্স এবং বাণিজ্য শিক্ষা চালু ছিল না। এটা বৃটিশ সরকারের একটা ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। পক্ষান্তরে বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত কিছু কলেজে বাণিজ্য বিভাগ ছিল। যেমন, বি এম কলেজ, বরিশাল, কুষ্টিয়া কলেজ, মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ, এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা ইত্যাদি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি, কম পড়ানো হতো। পশ্চিম বাংলার আরো কিছু কলেজে বাণিজ্য শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। কলকাতার সিটি কলেজ, রিপন কলেজ, বিদ্যাসাগর কলেজ, আনন্দ রাম জয়পুরিয়া কলেজে বাণিজ্য শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। এ কলেজগুলো সবই কলকাতায় অবস্থিত। আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি, কম ও এম, কম পড়ানোর ব্যবস্থা ছিল। উল্লেখ্য যে, ১৯৪৫ সালে সরকারি এম, সি কলেজ সিলেটে আই, কম পড়ানো শুরু হয়— কিন্তু সিলেট জেলা তখন আসাম প্রদেশে অবস্থিত ছিল। অর্থাৎ বাংলায় কোন সরকারি কলেজে বাণিজ্য শিক্ষা এবং বাংলা অনার্স কোর্স পাঠদানের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। উল্লেখ্য যে, রাজশাহী কলেজের শতবর্ষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমি এবং আমার সহকর্মী বাংলা বিভাগের হারুন সাহেব (ড. হারুন-অর-রশীদ অবসরপ্রাপ্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক) কৃতি ছাত্রদের তালিকা প্রস্তুতের লক্ষ্যে আমরা প্রাক্তন ছাত্রদের ফলাফল পর্যালোচনা করি ক্লাশ শেষে। ফলাফলের ফাইল নিয়ে আমরা প্রশাসন ভবনের একটি কক্ষে বসে কাজ করি। কিন্তু অনার্সের ফলাফলে বাংলা বিভাগের কোনো উল্লেখ নেই দেখে জনাব হারুন অস্থির হয়ে যাচ্ছেন— বাংলা বিভাগের ফলাফল নেই কেন? এর মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. গোলাম সাকলায়েন-এর সাথে দেখা করা মনস্থ করি। আমার বাবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে বসবাস করি তাই দায়িত্বটি আমি নিলাম। তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে অনার্স করেছিলেন সেটি আমরা জানতাম। তাকে আমি বিষয়টি জানালে তিনি যে তথ্য দিয়েছিলেন তা নিম্নে বর্ণিত হলো :

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ৮ জন ছেলে বাংলা বিভাগের একমাত্র শিক্ষককে বাংলায় অনার্স পড়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। তিনি রাজি হন এবং অধ্যক্ষের মহোদয়ের কাছে আসেন। অধ্যক্ষ প্রস্তাব শুনে সাথে সাথে প্রচণ্ডভাবে আপত্তি করেন। বিভাগে একমাত্র শিক্ষক আপনি, কিভাবে অনার্স কোর্স চালাবেন? পরে শিক্ষকের জন্য চাপ দেবেন। শিক্ষক আমি আনতে পারবো না। ঐ শিক্ষক বলেন, যতদিন শিক্ষক আসবে না ততদিন আমি হাইস্কুলের মত ক্লাস নেব। ছাত্ররাও অধ্যক্ষের হাতে পায়ে পড়ার মত অবস্থা করে অধ্যক্ষের সম্মতি আদায় করে। শিক্ষাবর্ষ জুলাই থেকে জুন। কিন্তু তারা অধ্যক্ষের অনুমতি পেলেন আগস্ট-এর শেষে। উল্লেখ্য যে, দেশ ভাগের পর মুসলিম বাঙালিরাই এই কলেজে বাংলা পড়ার পথ উন্মুক্ত করলো। কিছু বিলম্ব হলেও রাজশাহী কলেজে বাংলায় অনার্স চালু হল ১৯৪৭-এর আগস্টের শেষে। কিছুদিন পর বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ড. এনামুল হক। এই আটজনের মধ্যে চারজনই পেলেন প্রথম শ্রেণি— মারাত্মক ফলাফল! এই চারজন যথাক্রমে প্রফেসর ড. কাজী আব্দুল মান্নান, প্রফেসর ড. মাযহারুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দার রশীদ এবং চতুর্থ নাম আমি মনে করতে পারছি না। এই চারজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ পরীক্ষাতে প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন। প্রথমোক্ত দু’জন আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং তৃতীয় জন রাজশাহী কলেজে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঐ আটজন ছাত্রের মধ্যে ড. গোলাম সাকলায়েন একজন। কারমাইকেল কলেজ রংপুরে বাংলা অনার্স চালু হয় ১৯৫৪ সালে এবং সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে বাংলা অনার্স কোর্স খোলা হয় ১৯৫৬ সালে।

কলকাতায় কয়েকটি কলেজে বাণিজ্য শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও ছাত্রদের প্রচুর প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে দিয়ে তাদের পড়াশোনা করতে হতো। যেমন তখন যেসব মুসলমান ছাত্ররা সেখানে বাণিজ্য বিভাগে পড়তো তাদের কোনো ছাত্রাবাসে জায়গা দেয়া হতো না। এমনকি মেসগুলো ও জায়গা দিতে চাইতো না। তার একটি কারণ ছিল এই যে, বাণিজ্য বিভাগের ক্লাসগুলো তখন সাধারণত রাতে হতো। সন্ধ্যে বেলা ক্লাস শুরু হয়ে রাত দশটায় শেষ হতো। এত রাতে ছেলেরা হোস্টেলে বা মেসে ফিরলে তাদের খাবার দেয়া একটা সমস্যা— কারণ হোস্টেলের স্বাভাবিক নিয়ম সন্ধ্যা বেলা খাবার দেয় শুরু হয়ে রাত আটটার মধ্যে শেষ হয়ে যেতো। এমতাবস্থায় বাণিজ্য বিভাগের মুসলমান ছাত্ররা ১৯৪৬ সালে একত্র হয়ে তদানিন্তন শিক্ষামন্ত্রীর সাথে দেখা করে তাদের হোস্টেলের প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেন। এদের নেতৃত্ব দেন জনাব হান্নান (পরবর্তীকালে আযম খান কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন)। শিক্ষামন্ত্রীর সাথে সেদিন যাঁরা হোস্টেল সমস্যা নিয়ে কথা বলেছিলেন তাঁদের একজন আমার শিক্ষক প্রফেসর ড. আজগর আলী তালুকদার, মার্কেটিং বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজের শতবর্ষ উপলক্ষে এসব বিষয়ে তাঁর সাথে আমার বিস্তর কথা হয়েছিল। তালুকদার স্যারের বর্ণনাই আমি এখানে লিপিবদ্ধ করছি।

বছরটি ছিল ১৯৪৬। সবে মাত্র বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধের মত মারাত্মক একটি ব্যাধি থেকে মুক্তি পেলেও তার ক্ষত চিহ্ন সমগ্র শরীরে বিদ্যমান। শিক্ষামন্ত্রী তাঁদের বললেন, হোস্টেল নির্মাণ এই মুহূর্তে সম্ভব নয়— তোমরা একটি বাড়ি খোঁজ কর যেটা আমরা ভাড়া করে দেব। মন্ত্রীর সম্মতি পেয়ে তাঁরা বাড়ি খুঁজতে শুরু করলেন এবং পার্কলেনে একটি মাড়োয়ড়ির দু’টো আটতলা বিশিষ্ট পাশাপাশি বাড়ির খোঁজ পেলেন। বাড়ি দু’টোতে আমেরিকান সৈন্যরা ছিল। তারা যাবার পর মাড়োয়ারী বাড়ি দু’টো মেরামত করাচ্ছিলেন। ছাত্ররা সবাই একত্রিত হয়ে হৈ হৈ করে বাড়ি দুটো দখল করলে মাড়োয়ারী এসে হিন্দি ভাষায় মিনতি ক’রে বলে, বাবারা একি করছো? আমার বাড়ির মেরামতির কাজ চলছে। ছাত্ররা বললো, আপনার মেরামতিও হবে এবং ভাড়াও পাবেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় আপনার বাড়ি ভাড়া নেবে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নেবার আগেই কলকাতায় সাম্প্রদায়িক হানাহানি শুরু হয়ে যায়। এমতাবস্থায় কিছু মুসলমান ছাত্র এখানে পড়ে আছে জেনে কারমাইকেল হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট এসে তাদের ডেকে নিয়ে যান— এবং বলেন যে, তোমরা সাম্প্রদায়িক হানাহানি না থামা পর্যন্ত ডাব্লিং বা ফ্লোরিং করে এখানেই থাক। পরবর্তীকালে শিক্ষামন্ত্রী ঐ বাড়ি দু’টোকে হোস্টেলের জন্য ভাড়া করেন। এবং হোস্টেলের নাম করণ করেন— সিরাজ-উদ-দ্দৌলা হল। অতএব আমরা এখানে থেকে অনুমান করতে পারছি যে, বাণিজ্য শিক্ষার জন্য সে সময়ের ছাত্রদের প্রচণ্ড ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল (প্রফেসর ড. আজগর আলী তালুকদার সাহেবের দেয়া তথ্য)।

এরপর ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ হলে দু’টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়— ভারত ও পাকিস্তান। স্বভাবতই মুসলমানদের একটি অংশ পাকিস্তানে চলে আসে। দেশ বিভাগ হওয়ার পর কলকাতা কমার্শিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ জনাব আবদুস সামাদ কলেজের সম্পত্তির আধা-আধি ভাগ করে নিয়ে পানির জাহাজে করে চট্টগ্রামে এসে উঠেন। এবং তিনি চট্টগ্রাম কমার্শিয়াল Institute স্থাপন করেন যা পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা কলেজে বাণিজ্য বিভাগ খোলা হয়— এবং আই, কম ক্লাসে ছাত্র ভর্তি শুরু হয়। কিন্তু বি, কম কোর্স চালু হয় অনেক পরে।

রাজশাহী কলেজে বাণিজ্য বিভাগ খোলা হয় ১৯৫২ সালে। ১৯৫২ সালে আই, কম ক্লাস শুরু হলে ১৯৫৪ সালের আই, কম পরীক্ষায় যারা পাশ করে তাদের নিয়ে ১৯৫৪ তেই রাজশাহী কলেজে বি, কম খোলা হয়। সরকারি কলেজগুলোর মধ্যে রাজশাহী কলেজেই প্রথম যেখানে এত দ্রুত বি, কম খোলা হয়। এতদঞ্চলে বাণিজ্য শিক্ষার দ্রুত সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে রাজশাহী কলেজ বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। ১৯৫২ সালে বাণিজ্য বিভাগ খোলা হলে এখানে শিক্ষক হয়ে আসেন প্রফেসর আজমত উল্লাহ ও প্রফেসর আজগর আলী তালুকদার। এঁরা দু’জনেই প্রথম রাজশাহী কলেজে বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক হবার গৌরব লাভ করেন। রাজশাহী কলেজের শতবর্ষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত ‘শতবর্ষ স্মরণিকা ৮৮’ তে ১৯৫৪ সালের শিক্ষক তালিকায় এঁদের নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে। ”Department of Commerce-1. Mvi Azmot Ullah, 2. Mvi, Asgar Ali Talukder’.  প্রফেসর আজগর আলী তালুকদার একটি প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাজ্য চলে গেলে জনাব নুরুন্নবী (রাজশাহীর বিখ্যাত আয়কর উকিল) শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ১৯৫৪ সালে। পরবর্তীকালেও বহু কৃতি শিক্ষক বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষকতা করে গেছেন। জনাব সত্যবান দাস, জনাব নাজির উদ্দীন আহমদ, জনাব শাফায়াত আহমদ, জনাব আবদুর রহমান, জনাব গাজী আবদুস সালাম, জনাব মোহাম্মদ মুর্তোজা মিঞা, জনাব শফিকুল ইসলাম প্রমুখ সুযোগ্য শিক্ষকরা রাজশাহী কলেজের বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। উল্লেখ্য যে, সত্যবান দাস বাণিজ্য বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি কানাডা থেকে এম,বি,এ ডিগ্রি করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি দেশ ত্যাগ করে ভারত চলে যান। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম,কম কোর্স চালু হয় ১৯৪৮ সালে।  প্রথম বর্ষে সাত ছাত্র ভর্তি হয়। চারজন ছাত্র কৃতিত্বের সাথে এম,কম পাস করেন; প্রফেসর ড. আজগর আলী তালুকদার তন্মধ্যে একজন।

১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ সালেই বিশ্ববিদ্যালয় তার পরীক্ষাসমূহ গ্রহণ করে। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস হতো রাজশাহী কলেজে। সে বছর রাজশাহী বিভাগ (তখন যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, রাজশাহী বিভাগের মধ্যে ছিল) থেকে আই,কম পরীক্ষায় মোট ২১২ জন অংশগ্রহণ করে। আর বি,কম পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মোট ২৬ জন। ১৯৫৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধীনে এম,কম (প্রিভিয়াস)-এ ভর্তি শুরু হয়। তখন অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ছিলেন ড. এমটি হক। ১৯৫৮ সালে বাণিজ্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন প্রফেসর শামসুল ইসলাম। পরবর্তী বিভাগীয় প্রধান হন প্রফেসর মকবুল হোসেন (শিক্ষক হিসেবে তিনি যোগদান করেন ১৯৫৭ সালে)। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রফেসর শামসুল ইসলাম বাণিজ্য বিভাগের প্রধান হলেও তিনি অর্থনীতির শিক্ষক ছিলেন। প্রফেসর মকবুল হোসেন সাহেবই প্রথম যিনি বাণিজ্য বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা (এম.কম) গ্রহণ করে এই বিভাগে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে তিনি পশ্চিম জার্মানী থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে তিনিই প্রথম বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক যিনি পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে বাণিজ্য বিভাগে যোগদান করেন প্রফেসর আজগর আলী তালুকদার ও অছিম উদ্দীন মন্ডল।

রাজশাহী কলেজকে কেন্দ্র করে উত্তর অঞ্চলে বাণিজ্য শিক্ষার অগ্রযাত্রা শুরু। এই কলেজ থেকে বহু কৃতি ছাত্র বাণিজ্য শাখায় ভাল ফলাফল লাভ করেছে— যারা আজ দেশে-বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। বৃটিশ সরকার যে বাণিজ্য শিক্ষা সম্প্রসারণের কোনো ব্যবস্থাই করেনি আজ তা সম্প্রসারিত হচ্ছে মারাত্মক গতিতে। ছেচল্লিশটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সাতানব্বইটির  অধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ বাণিজ্য শিক্ষা এগিয়ে চলেছে এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে।

 

ড. মো. গোলাম কিবরিয়া* (১৯৫৮)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

×