পাকিস্তানের ইতিহাসের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। আওয়ামী লীগ ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়লাভ করায় বাঙালি জাতি আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছিল। এবার বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার আলোকে আমাদের স্বাধীকার অর্জন হবে। তখনও আমরা ভাবতে পারিনি স্বৈরাচারী ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা ছাড়বেন না। ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হঠাৎ করে এক বেতার ঘোষণায় অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ রূপ ধারণ করে। ৭ই মার্চের রমনা রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধু প্রেরণা ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং মানুষের মনে স্বাধীনতা লাভের বীজ বপন করেছিলেন। তিনি তাঁর ভাষণের এক জায়গায় বলেন, ‘তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ এরপর থেকে ছাত্র, যুবক, কৃষক, শ্রমিক ৩০৩ রাইফেল নিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। এমনকি মেয়েরাও ডামি রাইফেল নিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে ইয়াহিয়া খান ১৬ই মার্চ ঢাকায় এলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার জন্য। শেখ মুজিবের সঙ্গে প্রহসনের আলোচনা চলতে থাকে আর তলে তলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অতিরিক্ত সৈন্য ও অস্ত্র এনে ঢাকায় মজুদ করতে থাকে। আলোচনায় কোনো অগ্রগতি নেই। বঙ্গবন্ধু অনড়; স্বায়ত্বশাসনের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়। ২১ শে মার্চ ভুট্টো সাহেব ঢাকায় এলেন। ক্ষমতালোভী ভুট্টো ৮৫টি আসন পেয়ে সংখ্যালঘিষ্ঠ দল হয়েও ক্ষমতা দাবি করে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে করেন। ২৫ শে মার্চ রাত পোনে ৮টায় গোপনে ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন। এর আগে তিনি জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বেলুচিস্তানের কসাইখ্যাত টিক্কা খানকে গণহত্যার নির্দেশ প্রদান করেন।
পাকিস্তানের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্র সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রদের সাহসী ভূমিকার কারণে প্রতিটি আন্দোলন আলোর মুখ দেখতে পায়। রাজনৈতিক নেতদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রেখে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। এই কারণে ছাত্রদের প্রতি পশ্চিমাদের ক্রোধ পুঞ্জিভুত হয়েছিল। এই ক্রোধের প্রকাশ আমরা দেখতে পেলাম ২৫ শে মার্চ রাতে। তিন ব্যাটেলিয়ান সৈন্য ভারী অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাত ১১টার কিছু পরে পৃথিবীর নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড আরম্ভ করে। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে আক্রমণ চালায়; পাশের বাবুপুরা বস্তি বাদ পড়ল না। এরপর পিলখানা ইপিআর, হেড কোয়ার্টার, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে হত্যাযজ্ঞের পর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিল। ইয়াহিয়া-টিক্কার আস্ফালন ছিল, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে অর্থাৎ ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাত সাড়ে বারোটায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু ঢাকায় নয়, প্রতিটি জেলা ও মহকুমা শহরেও চালায়। এর সাথে ছাত্র-যুবক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আটক করতে শুরু করে। আটকের পর চলে নির্যাতন। অমানুষিক নির্যাতন করে গোপন তথ্য আদায়ের চেষ্টা করে। এক সময় তাদের মেরে ফেলা হতো; ভাগ্যগুণে কেউ কেউ বেঁচে যেতেন। এমনই ধরপাকড়ের শিকার হয়েছিল লায়েক আলী। দেশের উত্তেজনাকর অস্থির পরিস্থিতিতে রাজশাহী কলেজের হোস্টেলে অথবা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধবের বাড়িতে থাকা নিরাপদ মনে না করে গোদাগাড়ী সদরে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সুদর্শন যুবক, গায়ের রঙ ফর্সা, প্রায় ৬ ফুট লম্বা, স্বাস্থ্য ভালো। রাজশাহী কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র; উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে মেধা তালিকায় ৭ম স্থান অধিকার করেছিল। ২৭ শে মার্চ সকাল ১১টায় গোদাগাড়ীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যাওয়ার পথে বিপদে পড়ে গেল। রাজশাহী শহরের পশ্চিমে কাঁঠালবাড়িয়া নামক স্থানে পাকসেনারা চেকপোস্ট বসিয়েছিল। এখনকার মতো রাজশাহী শহরের মাঝ দিয়ে সিটি বাইপাস রোড ছিল না। তখন আদালত এলাকার পাশ দিয়ে কাঁঠালবাড়িয়া হয়ে নবাবগঞ্জ যাওয়ার পথ ছিল। উঁচু থেকে ঢালুতে নামতেই সেনাদের চেকপোস্ট ছিল। কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। লায়েক বাঘের মুখে পড়ে গেল। নবাবগঞ্জগামী বাস থেকে লায়েক আলীসহ ৭ জনকে সেনারা নামিয়ে নিল।
গোদাগাড়ী বাসস্ট্যান্ডের পান-দোকানি মতিও ঐ বাসের যাত্রী ছিল। অন্যদের সাথে তাকেও পাকসেনারা বাস থেকে নামিয়ে ছিল। সে উচ্চতায় ছোটখাটো, স্বাস্থ্যও তেমন ভালো ছিল না, হাঁটাচলায় ত্রুটি ছিল। সম্ভবত এই কারণে পাকসেনাদের মনোযোগ তার প্রতি কম ছিল। সে বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে একটু একটু করে সরে গিয়ে দলছুট হয়ে যায়। সেনাদের চোখের আড়াল হওয়া মাত্র দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়। সে এত ভয় ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছিল যে, বাসে চেপে গোদাগাড়ী যায়নি। পায়ে হেঁটে মেঠোপথে গন্তব্যে গিয়েছিল। পরবর্তীতে লায়েকের ঘটনাটি তার কাছ থেকেই জেনেছিলাম।
লায়েকের দুলাভাই প্রফেসর আব্দুল খালেক তাঁর চেষ্টামতো খোঁজাখুঁজি করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। লায়েকের পিতা তখন রংপুরের ভুরুঙ্গামারী থানায় কর্মরত ছিলেন; সঙ্গে ছিলেন লায়েকের মা ও তিন বোন। লায়েকের পাকসেনা কর্তৃক ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা পিতামাতার কাছে তৎক্ষণাৎ পৌছানো যায়নি। কিছুদিন পরে লায়েকের বড় ভাই লিয়াকত আলী মুর্শিদাবাদ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং জলপাইগুড়ি জেলার বর্ডার দিয়ে ভুরুঙ্গামারী প্রবেশ করে পিতামাতার কাছে যান। তখনই তাঁর গোটা পরিবার লায়েকের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে পারে। মা ও ৩ বোনকে সাথে নিয়ে ফিরে লায়েকের বড় ভাই মুর্শিদাবাদের লালগোলায় তাদের এক চাচার বাসায় কিছুদিন থেকে গোদাগাড়ী ফিরে আসেন। লায়েকের পিতা এক সময় রাজশাহী ফিরে সম্ভাব্য সবখানে লায়েকের সন্ধান করে ব্যর্থ হন। গোটা পরিবার লায়েকের অনুপস্থিতিতে একাত্তরের নয় মাস ঘোরের মধ্যে পার করেছে। লায়েকের পরিবারের আক্ষেপ, সেতো রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। লেখাপড়াই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী সন্তানটি তাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাওয়ায় গোটা পরিবার দিশেহারা, বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের নয় মাস দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটল। পরিবারের আশা ছিল পাকসেনারা কোনো বন্দিশালায় লায়েককে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। মা নাওয়া খাওয়া ছেড়ে জায়নামাজে বসে ছেলের নিরাপদে ফিরে আসার জন্য আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেছেন আর কান্নাকাটি করেছেন।
লক্ষ প্রাণের আত্মত্যাগ, অনেক মায়ের কোল খালি করে, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। পরিবারের বুকভরা আশা লায়েক শত্রুর বন্দিশিবির থেকে মুক্ত হবে, মায়ের কোলে ফিরে আসবে। এই বুঝি লায়েক মা বলে ডাক দিলো। পরিবারের প্রতিক্ষার আর অবসান হলো না। লক্ষ শহিদের মিছিলে লায়েক মিশে গেছে। মা হয়তো এখনো সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
মো. আলাউদ্দিন
ব্যাচ ১৯৭১
বিজ্ঞান বিভাগ, ক শাখা
রাজশাহী কলেজ
সহকারী মহাব্যাবস্থাপক (অব)
পূবালী ব্যাংক লিমিটেড।
